একটি দেশের অর্থনীতির শক্তি নির্ভর করে তার শিল্প খাতের ওপর। শিল্প সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, রপ্তানি শক্তিশালী হয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা তৈরি হয় এবং সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান একের পর এক বন্ধ হতে শুরু করলে তার প্রভাব কেবল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক অভিঘাত পড়ে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের আটটি শিল্পাঞ্চলে মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজারো শ্রমিকের কর্মহীন হয়ে পড়া, অসংখ্য পরিবারের অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট।
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বন্ধ হওয়া কারখানার ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশের মূল কারণ দুটি—পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাব এবং মালিকপক্ষের আর্থিক সংকট। মোট ২০৫টি কারখানা ওয়ার্ক অর্ডার না থাকায় এবং ১৯০টি কারখানা মূলধনের সংকটে বন্ধ হয়েছে। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ১১টি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংক-সংক্রান্ত জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, কাঁচামালের অভাব ও কারখানা স্থানান্তরসহ অন্যান্য কারণে আরও ৫১টি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেডও এই তালিকায় রয়েছে। আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের ১৬ জুন স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যার মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৭০০।
শিল্পাঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়ায়। দেশে মোট ১০ হাজার ২৩৮টি কারখানার মধ্যে আশুলিয়ায় ১২৪টি, গাজীপুরে ১৫৫টি, চট্টগ্রামে ১১৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৮টি, ময়মনসিংহে ৮টি, খুলনায় ৬টি এবং কুমিল্লায় ৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি, বিকেএমইএর সদস্য ৩৫টি, বিটিএমএর সদস্য ৮টি এবং বেপজার আওতাধীন ১৯টি কারখানা রয়েছে। বাকি ২৮৭টি বিভিন্ন স্বাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
কারখানা বন্ধের ঘটনাকে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি শত শত শ্রমিক যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, খাদ্য ব্যবসা, বাসাভাড়া, ক্ষুদ্র দোকান ও নানা ধরনের সেবা খাতের মানুষের জীবিকাও একটি কারখানার ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি কারখানা বন্ধ হলে তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
বন্ধের প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই শ্রম আইন অনুযায়ী নোটিশ দিয়ে সম্পন্ন হলেও শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের আগাম অবহিত না করেই কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকার বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করতে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৩২২টি কারখানা এই সুবিধা পেতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯টি সম্পূর্ণ বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাই চলছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশলসহ শ্রমঘন শিল্প খাত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই খাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ওঠানামার পাশাপাশি দেশে উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ, ডলারের সংকট, কাঁচামাল আমদানির জটিলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তা শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল কিংবা ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত কার্যকর মূলধনের অভাবে অনেক উদ্যোক্তার কাছে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না।
এর পাশাপাশি নীতিগত অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। করনীতি, ব্যাংকিং নীতি, আমদানি নীতি কিংবা জ্বালানি সরবরাহে ঘন ঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণ একটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত; সেখানে স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ হওয়ার পরও সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে সমন্বিত উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। শিল্প মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। ঝুঁকিতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সহায়তার ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট মোকাবিলায় ঝুঁকিতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। সাময়িক তারল্য সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান, বাজার সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সমস্যায় থাকা প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে মূল্যায়ন করে সহায়তা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন, সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল এবং কার্যকর মূলধনের ব্যবস্থা শিল্প পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে শিল্পঋণকে শুধু বাণিজ্যিক লাভের বিষয় হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকেও মূল্যায়ন করা জরুরি। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক দ্রুত প্রতিক্রিয়া সেল গঠনও সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে।
শ্রমিকদের জন্য অস্থায়ী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করাও বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে কারখানা বন্ধ হলে তারা অন্তত নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
অন্যদিকে উদ্যোক্তাদেরও আর্থিক স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পের টেকসই উন্নয়নে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়বে, শুল্ক সুবিধা কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প থাকবে না। এমন সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হতে থাকলে তা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শিল্পের চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠা মানে শুধু উৎপাদন নয়; এর অর্থ কর্মসংস্থান, মানুষের আয়, বাজারের প্রাণচাঞ্চল্য, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রবাহ অব্যাহত থাকা। তাই কারখানার তালাবদ্ধ গেট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই একটি সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন সমস্যার গভীরে গিয়ে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের, যাতে শিল্পের চাকা আবারও পূর্ণগতিতে ঘুরতে পারে।
- লেখক: মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল, কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা

