দেশের সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো ৮০০ কোটি টাকার কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। কার্যকর করনীতি, শক্তিশালী কপিরাইট সুরক্ষা, আধুনিক আইনি কাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে চলচ্চিত্র, ওটিটি, প্রকাশনা, শিল্পকলা, থিয়েটার ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
আজ শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা: ক্রিয়েটিভ ইকোনমি—স্লোগান নাকি সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব মতামত উঠে আসে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও উদ্যোক্তা তানিম নূর, চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, নাট্যকার ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বাকার বকুল, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন এবং ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম।
আলোচনায় জানানো হয়, নতুন অর্থবছরের বাজেটে সৃজনশীল বা অরেঞ্জ অর্থনীতির বিকাশে মোট ৮০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সৃজনশীল খাতের অবদান বাড়ানো, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত নীতিগত সহায়তার অভাব, কর কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, কপিরাইট সুরক্ষার দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সংকটের কারণে এ খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।
চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বলেন, সৃজনশীল শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আলাদা করনীতি প্রণয়ন জরুরি। বিশেষ করে চলচ্চিত্র শিল্পে কর সুবিধা দেওয়া হলে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তারাও এই খাতে আগ্রহী হবেন।
চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি বলেন, চলচ্চিত্র ও ওটিটি শিল্পের বিকাশে অবকাঠামো উন্নয়ন, করব্যবস্থার সংস্কার এবং লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। তার মতে, স্পষ্ট নীতিমালার অভাবে দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশ থেকে আয় করলেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মতো একই ধরনের নীতিগত বাধ্যবাধকতার আওতায় নেই।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, দেশে সৃজনশীল মানুষের অভাব নেই। তবে তাদের দক্ষতা বিকাশ, বাজার তৈরি এবং বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি শিল্পীদের পাশাপাশি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক কর্মীর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
নাট্যকার বাকার বকুলের মতে, বাংলাদেশে নাটক ও শিল্পকলাকে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। ফলে এসব খাত দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত আগ্রহ ও ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। টেকসই শিল্পখাত গড়ে তুলতে শিল্পীদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রকাশনা শিল্পের প্রসঙ্গ তুলে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, জাতীয় গ্রন্থনীতির আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বইয়ের বিস্তার এবং কার্যকর কপিরাইট আইন বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তার মতে, মুদ্রিত ও ডিজিটাল—উভয় ধরনের বইয়ের পাইরেসি প্রকাশনা শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ।
হস্তশিল্প উদ্যোক্তা মো. তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সনদায়ন এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিংয়ের বিকল্প নেই।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুধু অর্থ বরাদ্দ বা অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট হবে না। করনীতি, কপিরাইট সুরক্ষা, রয়্যালটি বণ্টন এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি।

