২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও কার্যক্রম সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে ৩০ হাজার ১৯৯টি, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরের পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রতিবেদন।
গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউর প্রধান ইকতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তার ভাষ্য, অর্থপাচার প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি জোরদার হওয়া, রিপোর্টিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠোর নিয়ম বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন জুয়া, বেটিং, বৈদেশিক মুদ্রা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো নতুন ঝুঁকিপূর্ণ মাধ্যমও সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর)। এসব প্রতিবেদনে এমন নির্দিষ্ট লেনদেনের তথ্য থাকে, যেগুলো অর্থপাচার বা অন্য আর্থিক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। এ ছাড়া ৯ হাজার ৬৭৫টি সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসএআর) জমা পড়ে। এগুলোতে গ্রাহকের অস্বাভাবিক আচরণ বা আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য থাকে, যা আরও তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে, যদিও কোনো নির্দিষ্ট সন্দেহজনক লেনদেন তখনও শনাক্ত হয়নি। পুরো অর্থবছরে জমা পড়া প্রতিবেদনের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে।
এ বিষয়ে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, অতীতে অনেক ব্যাংক সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য দিতে অনীহা দেখাত। এখন সেই পরিস্থিতি বদলেছে। ফলে ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ১০৬টি।
সংবাদ সম্মেলনে ইকতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন তদন্তের ক্ষেত্রে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। যার বিরুদ্ধে আইনভঙ্গের প্রমাণ মিলবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, বিভিন্ন রিপোর্টিং প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিএফআইইউ আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ১৯৯টি গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠিয়েছে। তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়।
বিএফআইইউ প্রধান আরও জানান, বিশ্বের ১৮০টি দেশের সমমানের সংস্থার সঙ্গে তাদের সমঝোতা স্মারক রয়েছে এবং এগমন্ট গ্রুপের নিরাপদ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং বছরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আশা করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “অর্থপাচারকারীদের কোনোভাবেই স্বস্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।”
১১ অগ্রাধিকার মামলায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ:
বিএফআইইউ প্রধান জানান, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারভিত্তিক মামলায় মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
তিনি জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিএফআইইউর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ টাস্কফোর্স এসব মামলা তদন্ত করছে। এই তদন্তের আওতায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্যরা এবং ১০টি বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ।
এ পর্যন্ত বিদেশি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) আবেদন পাঠানো হয়েছে এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি জানান, সম্পদ পুনরুদ্ধারে ফৌজদারি ও দেওয়ানি—উভয় ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ঋণ জালিয়াতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করে কাজ শুরু করেছে। বছরের শেষ নাগাদ দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে দৃশ্যমান অগ্রগতির আশা করছে বিএফআইইউ।
আরও এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা নয়, শুধু সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ঘটেছে কি না, সেটিই তদন্তের মূল বিষয়। অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নগদ লেনদেনের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩১ কোটি ৬০ লাখে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৯৩ কোটি ৫০ লাখ। একই সময়ে নগদ লেনদেনের মোট মূল্য ২৩ লাখ ৯০ হাজার ৯৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২০ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
সংস্থাটির মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায় নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমেছে। এর ফলেই নগদ লেনদেনের পরিমাণ ও মূল্য—উভয়ই হ্রাস পেয়েছে।

