বাংলাদেশের আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাবে একদিকে যেমন নতুন ফ্ল্যাটের বিক্রি কমছে, অন্যদিকে থমকে যাচ্ছে নতুন প্রকল্পও। খাতসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
নিবন্ধনের তথ্যেই স্পষ্ট মন্দার চিত্র:
নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে সারাদেশে ফ্ল্যাট হস্তান্তর বা দলিল নিবন্ধন হয়েছে ৪১ হাজার ৮০৪টি। এসব ফ্ল্যাটের ঘোষিত মূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই নিবন্ধিত হয়েছে ২৯ হাজার ৯১৩টি ফ্ল্যাট, যা মোট নিবন্ধনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
প্রথমার্ধের এই পরিসংখ্যান বলছে, আবাসন বাজারের মন্দা কাটার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং আগের বছরের তুলনায় বিক্রি আরও কমেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের গড়ের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে ফ্ল্যাট নিবন্ধন কমেছে ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এই পতন ২৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি-জুনের তুলনায় কমেছে ৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
পুরো বছরের হিসাবও একই প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ফ্ল্যাট নিবন্ধিত হয়েছিল, যার ঘোষিত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজারে এবং বাজারমূল্য হয় প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে নিবন্ধনের সংখ্যা আরও নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজারে।
রাজস্বেও প্রভাব:
ফ্ল্যাট কেনাবেচা কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) নিপেন্দ্র নাথ সিকদার জানান, ফ্ল্যাট নিবন্ধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সম্পত্তি নিবন্ধন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমেছে। তবে ঠিক কত পরিমাণ রাজস্ব কমেছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি।
নতুন প্রকল্পেও ধীরগতি:
শুধু বিক্রিই নয়, নতুন প্রকল্প গ্রহণেও সতর্ক হয়ে পড়েছেন ডেভেলপাররা। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি কামাল মাহমুদ বলেন, বর্তমানে জমির মালিকদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নতুন প্রকল্পের চুক্তি আগের তুলনায় অনেক কম হচ্ছে। অনেক প্রকল্প আর্থিকভাবে লাভজনক না থাকায় পুরোনো চুক্তিও বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
রিহ্যাবের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় এক হাজার যৌথ উন্নয়ন চুক্তি বাতিল হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই শুধু ঢাকায় আরও প্রায় ৪৫০টি চুক্তি বাতিল হয়েছে। এদিকে রিহ্যাবের কাছে এখনো প্রায় ১ হাজার ৬০০টি অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা অর্থ পরিশোধ করলেও এখনো ফ্ল্যাটের মালিকানা বুঝে পাননি।
নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ:
ডেভেলপারদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির পর এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকে নির্মাণসামগ্রীর দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অনেক পণ্যের দাম ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ১০০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে বাজারে এক ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৫৪০ থেকে ৫৮০ টাকায়। অন্যদিকে প্রতি টন এমএস রডের দাম ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে।
কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, কাঁচামালের সরবরাহ সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি নতুন বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রক শুল্ক আরোপ করায় বাজারে আরও মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, সামগ্রিক রডের বাজারে চাহিদা থাকলেও আবাসন কোম্পানিগুলোর ক্রয় আগের তুলনায় কমে গেছে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ের নির্মাণকাজে চাহিদা এখনো তুলনামূলক ভালো রয়েছে।
মাঝপথে থেমে যাচ্ছে প্রকল্প:
বাড়তি ব্যয় ও কম বিক্রির কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি ডেভেলপার নির্মাণকাজ শেষ করতে পারছেন না। রাজধানীর দক্ষিণ বারিধারার একটি প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে রূপসী বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহুরুল আহসান রোজ জানান, ৪৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২২টির বিক্রি নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ তৃতীয় তলার ছাদ পর্যন্ত এগোয়। কিন্তু বাকি ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ক্রেতাদের দেওয়া অর্থ দিয়েই যতদূর সম্ভব কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রকল্প সচল রাখতে কোম্পানির অংশের ফ্ল্যাট বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণের চেষ্টা চলছে।
বিপাকে ক্রেতারাও:
এই সংকটের প্রভাব শুধু ডেভেলপারদের নয়, ক্রেতাদের ওপরও পড়ছে। বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা দেবাশীষ রঞ্জন পাল ২০২৪ সালের মার্চে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করেন এবং অগ্রিম ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। দুই বছরের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার কথা থাকলেও আড়াই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি বলে তিনি জানান।
একই প্রকল্পের আরেক ক্রেতা চিকিৎসক শাহজাদা ইমরান হোসেনও প্রায় ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। তিনিও দীর্ঘসূত্রতার কারণে একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।
নতুন বাজেট নিয়ে উদ্বেগ: আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটে কয়েকটি সিদ্ধান্ত সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর
- রড ও সিমেন্টের ওপর ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রক শুল্ক
- অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগে কঠোর সীমাবদ্ধতা
বড় প্রতিষ্ঠানও চাপ অনুভব করছে:
শুধু ছোট ও মাঝারি নয়, বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাতেও মন্দার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শেলটেক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তাদের প্রায় ২৫ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে। একই সময়ে নতুন ফ্ল্যাট বিক্রি ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ কমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্টিল ও সিমেন্টের দাম বেড়েছে। আবার স্থানীয় উৎপাদকদের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে।
হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইমুল হাসান জানান, ২০২০ সালের আগে তাদের প্রতিষ্ঠান বছরে ৭ থেকে ৮টি প্রকল্প শেষ করলেও ২০২১ ও ২০২২ সালে তা নেমে আসে মাত্র তিনটিতে। ২০২৩ সালে শুরু করা চারটি প্রকল্পের ৭০ শতাংশ ফ্ল্যাট বিক্রি হলেও প্রকল্পগুলো এখনো সম্পন্ন হয়নি। ২০২৩ সালের পর নতুন কোনো প্রকল্পও তারা হাতে নিতে পারেননি।
বড় কোম্পানিগুলোও পুরোপুরি নিরাপদ নয়:
বাজারের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে আর্থিক সক্ষমতার কারণে টিকে আছে। তবে তারাও দীর্ঘমেয়াদি মন্দা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কনকর্ড গ্রুপের রিয়েল এস্টেট বিভাগের ব্র্যান্ড ম্যানেজার তারিকুল আলম বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলো কিছুটা সহায়তা করলেও আবাসিক বাজারের দুর্বলতা দীর্ঘদিন চললে এর প্রভাব তাদের সামগ্রিক ব্যবসাতেও পড়বে।
আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক ও সাউথ ব্রিজ হাউজিংয়ের প্রতিনিধিরাও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে, তবে বাজারে চাহিদা না ফিরলে তারাও দীর্ঘমেয়াদে চাপের বাইরে থাকবে না।
এদিকে রাজধানীর মগবাজারের একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক জানান, কয়েক বছর আগে একটি শীর্ষ ডেভেলপার একই এলাকায় একটি প্রকল্পের সব ফ্ল্যাট সহজেই বিক্রি করেছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় শুরু করা দ্বিতীয় প্রকল্পে এবার পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, এটি আবাসন বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

