বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোয় গত এক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে কৃষি খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, এখন সেই জায়গা দখল করেছে সেবা খাত। সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্ধেকেরও বেশি মূল্য সংযোজন এখন আসছে এই খাত থেকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতের মূল্য সংযোজন ১৮ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির প্রায় ৫২ শতাংশ। একই সময়ে চলতি মূল্যে দেশের জিডিপির পরিমাণ ছিল ৬১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।
এক দশকে বড় পরিবর্তন:
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সেবা খাতের মূল্য সংযোজন প্রায় পৌনে চার গুণ বেড়েছে। একই সময়ে শিল্প খাতের মূল্য সংযোজন বেড়েছে প্রায় সোয়া চার গুণ এবং কৃষি খাতের অবদান বেড়েছে প্রায় পৌনে তিন গুণ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি ক্রমেই সেবা খাতনির্ভর হয়ে উঠছে। বর্তমানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং কৃষি খাতের অবদান ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্য সংযোজন ও প্রবৃদ্ধি—দুই ক্ষেত্রেই এখন সেবা খাত দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। অন্যদিকে কৃষি খাতের গুরুত্ব থাকলেও জিডিপিতে এর অংশ ধীরে ধীরে কমছে। শিল্প খাতে মূল্য সংযোজন বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। পাশাপাশি সেবা খাতের বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় রয়েছে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে সেবা খাতের মূল্য সংযোজন ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১৮ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে শিল্প খাতের মূল্য সংযোজন প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায়। কৃষি খাতের অবদানও প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের সেবা খাতকে মোট ৯টি উপখাতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ও বিমা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, আবাসন এবং সরকারি সেবা।
সেবা খাত দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। ব্যাংক, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, দোকান, হোটেলসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শুধু নিজস্ব অবদানই নয়, শিল্প খাতের কার্যক্রমও অনেকাংশে নির্ভর করে ব্যাংকিং, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিপণন ও বিমাসেবার ওপর। একই সঙ্গে উন্নত লজিস্টিকস, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট এবং দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি সেবা বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, রেস্তোরাঁ, বিনোদন ও আর্থিক সেবায় মানুষের ব্যয়ও বাড়ছে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে কৃষি খাতের মূল্য সংযোজন ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সেবা খাতের মূল্য সংযোজন দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ কৃষি খাতের তুলনায় সেবা খাত প্রায় ৪ দশমিক ৭৭ গুণ বড়।
শিল্প খাতের মূল্য সংযোজন ছিল ১২ লাখ ৯০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। ফলে শিল্প খাতের তুলনায়ও সেবা খাত প্রায় দেড় গুণ বড় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে কৃষির তুলনায় শিল্প খাতের আকার প্রায় সোয়া তিন গুণ। তবে গত চার অর্থবছর ধরে কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিন খাতেই মূল্য সংযোজন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূল্য সংযোজন বাড়লেও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
উপখাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিডিপিতে সবচেয়ে বড় অবদান উৎপাদনমুখী শিল্পের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই উপখাতে স্থির মূল্যে প্রায় ৮ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে। শিল্প খাতের মোট অবদানের প্রায় ৬৮ শতাংশই এসেছে এই উপখাত থেকে। এর মধ্যে বৃহৎ শিল্পের অংশ ৫১ শতাংশ, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদান ৩১ শতাংশ এবং কুটিরশিল্পের অংশ ১৮ শতাংশ।
দ্বিতীয় বৃহত্তম অবদান এসেছে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য থেকে। সর্বশেষ অর্থবছরে এই উপখাতে মূল্য সংযোজন হয়েছে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাইকারি ব্যবসা যুক্ত করলে এই সংখ্যা প্রায় এক কোটিতে পৌঁছায়। সামগ্রিক সেবা খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ অবদান আসে শুধু এই উপখাত থেকেই। আকারের দিক থেকে এটি পুরো কৃষি খাতের প্রায় দেড় গুণ এবং বৃহৎ শিল্পের তুলনায়ও বেশি। অবদানের হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কৃষি খাত। এখানে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয় শস্য ও ফসল উৎপাদন থেকে। এছাড়া মৎস্য, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন এবং বন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকেও উল্লেখযোগ্য অবদান আসে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্মাণ খাতের মূল্য সংযোজন ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এই খাতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ, সেখানে সর্বশেষ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশে। যদিও গত এক বছরে এ খাতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতের মূল্য সংযোজন হয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। মোট জিডিপিতে এ খাতের অংশ প্রায় পৌনে ৮ শতাংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জিডিপি কাঠামোয় সেবা খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি হওয়া উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্বাভাবিক প্রবণতা। তবে শুধু জিডিপিতে অংশের হার দেখেই অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কোন খাতে কত মানুষ কাজ করছেন এবং তাদের শ্রমের উৎপাদনশীলতা কত—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি এখনো কৃষি খাতে নিয়োজিত হলেও জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১১ শতাংশের কাছাকাছি। এটি কৃষি খাতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কম থাকারই ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকেই আগামী দিনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

