প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, অটোমেশন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এগোতে না পারায় ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতিনির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
গত বুধবার রাতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘পরিবর্তনশীল কর্মজগৎ: বৈশ্বিক দক্ষিণে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে দূরদর্শী ভাবনা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে শ্রমবাজারের কাঠামো দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। তাঁর মতে, অতীতের তথ্য ও প্রচলিত পূর্বাভাসভিত্তিক পদ্ধতি এখন আর ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের পরিবর্তন যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম নয়।
তিনি বলেন, অনিশ্চয়তাপূর্ণ এই বাস্তবতায় সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং কার্যকর নীতি প্রণয়নে ‘ফোরসাইট’ বা দূরদর্শী বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়েবিনারটি আয়োজনের সহযোগী ছিল জাস্টিজ নেটওয়ার্ক, লার্নএশিয়া, সাউদার্ন ভয়েস এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। এটি ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (আইডিআরসি) সহায়তায় ‘ফিউচার ওয়ার্ক এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে পরিচালিত সিপিডির গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন সংস্থাটির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি জানান, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশের কর্মসংস্থানের গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে এমন ২৭টি প্রধান পরিবর্তনশীল উপাদান গবেষণায় শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার এবং দেশের সামাজিক আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অনিশ্চয়তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কয়েকটি প্রবণতা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিদ্যমান থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটালাইজেশনের আরও বিস্তার, অর্থনীতির উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী সেবা খাতের দিকে অগ্রসর হওয়া, দক্ষতার চাহিদা ও বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান অব্যাহত থাকা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতার মতো বহিরাগত ঝুঁকি বজায় থাকা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়া।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণা প্রতিবেদনে আটটি নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সংস্কার, আজীবন দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থানমুখী শিল্পনীতি প্রণয়ন, কার্যকর শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, গিগ ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের জন্য আধুনিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা।
ওয়েবিনারে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রোগ্রাম প্রধান ও এসএমই বিশেষজ্ঞ গুঞ্জন বাহাদুর ডাল্লাকোটি, শ্রীলঙ্কার লার্নএশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেলানি গালপায়া, আর্জেন্টিনার সুর ফিউতুরো ইনিশিয়েটিভের প্রধান রামিরো আলব্রিউ এবং ভারতের জাস্টজবস নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী পরিচালক সাবিনা দেওয়ান বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয় জরুরি। পাশাপাশি কর্মশক্তি উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, অটোমেশনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
তাদের মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন থামানো সম্ভব নয়। তবে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানে বৈষম্য কমাবে নাকি বাড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের সময়োপযোগী নীতি ও কার্যকর সিদ্ধান্তের ওপর।

