বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পথে এগিয়েছে সরকার। বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সেবা আরও সমন্বিত, দ্রুত ও সহজলভ্য করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে গঠন করা হচ্ছে নতুন প্রতিষ্ঠান ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’।
এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে আইনটি কার্যকর করবে। এরপর থেকেই নতুন সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে।
আইন কার্যকর হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক প্রকল্পের কার্যক্রম একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। সরকারের লক্ষ্য, বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে না হয়ে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা। এতে অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন নেওয়া হলো এই উদ্যোগ:
গত এক দশকে বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করলেও বাস্তবে তাদের অনেক কার্যক্রম পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে একজন উদ্যোক্তাকে শিল্প নিবন্ধনের জন্য এক সংস্থা, অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দের জন্য আরেক সংস্থা এবং অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হতো।
একই তথ্য একাধিকবার জমা দেওয়া, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করা এবং সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ছিল বিনিয়োগকারীদের অন্যতম অভিযোগ। এসব সমস্যার সমাধানেই সরকার একীভূত কর্তৃপক্ষ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিল্প নিবন্ধন, লাইসেন্স, বিভিন্ন ধরনের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, বিদেশি কর্মীদের ভিসা ও কর্মানুমতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিযোগাযোগসহ বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অধিকাংশ সরকারি সেবা এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই পাওয়া যাবে। এর ফলে একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমবে, সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং সেবার স্বচ্ছতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কী কী দায়িত্ব পাবে নতুন কর্তৃপক্ষ:
ইনভেস্ট বাংলাদেশ শুধু বিনিয়োগ উন্নয়ন নয়, অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা, পিপিপি প্রকল্প সমন্বয়, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নীতিগত সমন্বয়সহ বিস্তৃত দায়িত্ব পালন করবে। শিল্প নিবন্ধন থেকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন—সব কার্যক্রম একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীদের একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন কমবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন, ভিসা সুপারিশ, কর্মানুমতি, বিদেশি ঋণের অনুমোদন, ইউটিলিটি সংযোগসহ বিভিন্ন সেবা সমন্বিতভাবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আইনে এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি সংস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে ইনভেস্ট বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা সুপারিশ দিতে পারে।
নতুন আইনে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য সম্পদ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকার প্রয়োজনে এসব সম্পদ ইজারা, অংশীদারত্ব বা কৌশলগত বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর বাস্তবায়ন হলে নতুন শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রচলিত শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি নতুন আইনে বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সবুজ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, ব্লু ইকোনমি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, জলবায়ু সহনশীল শিল্প, লজিস্টিকস এবং উপকূলীয় শিল্পের মতো খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পনীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নতুন আইনে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। জাতীয় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প দ্রুত অনুমোদনের সুযোগ, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সরাসরি প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি অর্থায়ন, ইকুইটি বিনিয়োগ বা গ্যারান্টির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হবেন প্রধানমন্ত্রী অথবা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি। বোর্ডে অর্থ, শিল্প, বাণিজ্য, ভূমি, বিদ্যুৎ, পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সংশ্লিষ্ট সচিব এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা থাকবেন। সরকারের মতে, এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে।
বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরীর মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি কার্যকর ‘ওয়ান স্টপ’ বিনিয়োগ সংস্থার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থাও (ইউএনসিটিএডি) একই ধরনের সুপারিশ করেছে। তাঁর বিশ্বাস, নতুন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের আরও দক্ষ সেবা দিতে সক্ষম হবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কারণে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্তি ও জটিলতার মুখে পড়েছেন। একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গড়ে উঠলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে। তবে তিনি মনে করেন, সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তিনটি প্রতিষ্ঠানের জনবল ও প্রশাসনিক কাঠামো একীভূত করা, একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোও নতুন কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ সরকারের অগ্রাধিকার।
এই বাস্তবতায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থার অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি প্রতিশ্রুত ডিজিটাল সেবা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর সমন্বয় বাস্তবে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শুধু নতুন নাম বা কাঠামো পরিবর্তন বিনিয়োগ পরিবেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। তাই এখন নজর থাকবে—নতুন আইনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।

