একসময় দেশের অর্থনীতির চিত্র বুঝতে কারখানা, দোকানপাট, কৃষি আর বড় বড় সেবা খাতের হিসাবই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অর্থনীতির ধরনও বদলে গেছে। এখন স্মার্টফোনে পণ্য বিক্রি, অ্যাপের মাধ্যমে যাতায়াত, মোবাইল ফোনে আর্থিক লেনদেন, অনলাইনে কাজ করে আয় কিংবা ফুটপাতের ছোট দোকান—সবকিছুই মানুষের আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির এই পরিবর্তন জাতীয় হিসাবের খাতায় কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এর অংশ হিসেবে জিডিপির ভিত্তি বছর পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনীতিতে নতুন করে যুক্ত হওয়া বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে।
বর্তমানে স্থির মূল্যে জিডিপি হিসাবের ভিত্তি বছর হিসেবে ধরা হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরকে। তবে গত এক দশকে দেশের অর্থনীতির কাঠামো, মানুষের আয়, ব্যয়ের ধরন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তনকে হিসাবের মধ্যে আরও ভালোভাবে আনার জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরকে নতুন ভিত্তি বছর করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বিবিএস।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ভিত্তি বছর চালু হলে অর্থনীতির বাস্তব কর্মকাণ্ডের আকার ও পরিবর্তনের গতি বর্তমানের তুলনায় আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসতে পারে।
এ বিষয়ে বিবিএস মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শামীমুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জিডিপির ভিত্তি বছর পরিবর্তনে ইতিমধ্যেই একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যে কাজটি শেষ করা সম্ভব হবে।’
যে অর্থনীতি এত দিন পুরোপুরি ধরা পড়েনি
দেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর ও নতুন ধরনের ব্যবসার দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সোলার প্যানেল এবং ফ্রিল্যান্সিং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মকাণ্ড নয়। এসব খাতে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, আয় ও ব্যবসার সুযোগ।
অ্যাপভিত্তিক পরিবহন অনেক মানুষের জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে। একইভাবে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা অনেক নতুন উদ্যোক্তাকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। ঘরে বসে পণ্য বিক্রি থেকে শুরু করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে কাজ করে আয়—অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখন ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
শুধু প্রযুক্তিনির্ভর খাতই নয়, অর্থনীতির একেবারে নিচের স্তরে থাকা ছোট ছোট কর্মকাণ্ডও নতুন হিসাবের আওতায় আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ফেরিওয়ালা, নিজস্ব রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি বা ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক কিংবা রাস্তা ও ফুটপাতে ছোট দোকান চালানো—এসব কর্মকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত।
অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এ বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি খানাভিত্তিক এবং খানার বাইরে পরিচালিত এসব আয়মূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে দেশের অর্থনীতিকে শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক ব্যবসার মাধ্যমে দেখার পরিবর্তে ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ের কর্মকাণ্ডও হিসাবের মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কৃষির ক্ষেত্রেও তথ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। খামারভিত্তিক গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মৎস্য এবং নার্সারির মতো কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও শুমারির আওতায় এসেছে। অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতির হিসাব এখন বড় শিল্প বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটকে না থেকে ছোট উদ্যোক্তা, ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকেও বেশি নজর দিচ্ছে।
শুধু জিডিপি নয়, মূল্যস্ফীতির হিসাবও নতুন করে দেখার প্রয়োজন
অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে শুধু জিডিপির হিসাবই নয়, মূল্যস্ফীতির হিসাবও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআইয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করে। এজন্য নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবাকে একটি ঝুড়ির মধ্যে রেখে বিভিন্ন বাজার থেকে তাদের দাম সংগ্রহ করা হয়।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির তথ্য সংগ্রহের জন্য ১৫৪টি বাজার এবং ৭০০টির কিছু বেশি পণ্যের দাম বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু মানুষের জীবনযাপন ও ভোগের ধরন আগের মতো নেই। বাজারে নতুন নতুন পণ্য ও সেবা যুক্ত হয়েছে, আবার অনেক পণ্যের ব্যবহার ও মানুষের ব্যয়ের অগ্রাধিকারও বদলে গেছে।
ফলে বর্তমান নমুনা দেশের মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়কে কতটা সঠিকভাবে তুলে ধরছে, সেটি পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এ বিষয়ে বলেন, জিডিপি বা মূল্যস্ফীতি—যে ক্ষেত্রেই হোক, ভিত্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি হিসাবের ভিত্তি ও মানদণ্ডও যাচাই করতে হবে। নমুনার আকার বাড়ানো এবং সেটি যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বশীল কি না, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।
সঠিক হিসাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
জিডিপি শুধু একটি অর্থনৈতিক সংখ্যা নয়। দেশের বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন সরকারি নীতি নির্ধারণে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে অর্থনীতির প্রকৃত আকার যদি হিসাবের মধ্যে সঠিকভাবে না আসে, তাহলে নীতিনির্ধারণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
নতুন ভিত্তি বছর চালু হলে অর্থনীতির যেসব খাত গত এক দশকে দ্রুত বড় হয়েছে, সেগুলো জাতীয় উৎপাদনের হিসাবের মধ্যে আরও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে এত দিন যেসব ছোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান ছিল, সেগুলোর গুরুত্বও স্পষ্ট হতে পারে। একজন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক, ফুটপাতের দোকানি কিংবা ফেরিওয়ালার আয় আলাদা করে ছোট মনে হলেও দেশের কোটি মানুষের এমন অসংখ্য কর্মকাণ্ড মিলেই অর্থনীতির একটি বড় অংশ তৈরি হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভিত্তি বছর সাধারণত একটি স্থিতিশীল বছরকে ধরা হয়। সে হিসেবে উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে ভিত্তি বছরের তথ্য-উপাত্ত বাস্তবভিত্তিক হতে হবে এবং তার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতির নতুন চেহারা কতটা ধরা পড়বে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে শুধু আকারে নয়, কাঠামোগতভাবেও বদলেছে। মানুষের আয় করার পদ্ধতি বদলেছে, কেনাকাটার ধরন বদলেছে, নতুন ব্যবসা তৈরি হয়েছে এবং প্রযুক্তি অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছে।
তাই পুরোনো তথ্য ও পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্ভর করে অর্থনীতির বর্তমান চেহারা পুরোপুরি বোঝা কঠিন। নতুন ভিত্তি বছর সেই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে শুধু ভিত্তি বছর পরিবর্তন করলেই কাজ শেষ হবে না। নতুন খাতের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ, তথ্যের মান যাচাই এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সময়ের সঙ্গে হিসাবের মধ্যে যুক্ত করাও জরুরি।
কারণ অর্থনীতি থেমে থাকে না। আজ যে কর্মকাণ্ড নতুন, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। আবার বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাত ভবিষ্যতে ছোট হয়ে যেতে পারে।
সেই পরিবর্তনের সঙ্গে জাতীয় হিসাবও যদি নিয়মিতভাবে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, তাহলে জিডিপির সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান থাকবে না; বরং দেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরতে পারবে।

