সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের আর্থিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে দেশের সব লাইসেন্সধারী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে (এমএফআই) বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নতুন নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ঋণ আদায়ে নমনীয়তা দেখানো, প্রয়োজনে ঋণ পুনঃতফসিল করা এবং দ্রুত নতুন ঋণ বিতরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি জারি করা এক সার্কুলারে সংস্থাটি জানিয়েছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। টানা ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় এসব জেলার বহু মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, ব্যবসা এবং জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবার দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের দুর্যোগ তহবিল ব্যবহার করে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ কমাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিস্তি পরিশোধের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস বা ঋণ পুনঃতফসিল করার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। যেসব গ্রাহক বন্যার কারণে আয় হারিয়েছেন বা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনায় প্রয়োজন হলে নতুন জরুরি ঋণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যেন দ্রুত আবার আয়মুখী কর্মকাণ্ডে ফিরতে পারেন, সে জন্য নতুন ঋণ দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, গবাদিপশু পালন এবং অন্যান্য স্বনিযুক্ত পেশায় ফিরে আসতে এই আর্থিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সংরক্ষিত তহবিল থেকেই ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যয় নির্বাহ করতে হবে। তবে প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের জন্য এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে।
সাম্প্রতিক বন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং আশপাশের জেলাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক ফসল হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষুদ্রঋণ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের বড় একটি অংশ প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকায় ক্ষুদ্রঋণই তাদের প্রধান আর্থিক ভরসা। সময়মতো নতুন ঋণ ও কিস্তিতে ছাড় পেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।
ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০০৬ সালের আইনের আওতায় দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম তদারকি করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৯০০টিরও বেশি লাইসেন্সধারী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে, যারা ৪ কোটিরও বেশি ঋণগ্রহীতাকে সেবা দিচ্ছে। হাজার হাজার শাখার মাধ্যমে পরিচালিত এই খাত ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, স্বনিযুক্ত কর্মসংস্থান এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য, অতীতেও বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য হলো, একদিকে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা।

