পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গার কোলঘেঁষা ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে ক্রেন, লেদ মেশিন, মেটাল কাটিং আর লোহা গলানোর বিষাক্ত ধোঁয়া সরিয়ে এক ছাদের নিচে আনার স্বপ্ন নিয়ে মুন্সীগঞ্জে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশেষায়িত বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরী। ৩০৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি নির্মাণ শেষ হওয়ার চার বছর পেরিয়েও রয়েছে প্রায় জনশূন্য। ৫০ একর জমিতে মোট ৩৬১টি প্লটের মধ্যে মাত্র ২৯টি বা ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো কারখানা।
শিল্পনগরীটির এমন করুণ অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ প্লটের উচ্চ মূল্য ও অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। বিসিকের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি বর্গফুট জমির দাম ২ হাজার ১০৩ টাকা। এক কাঠা (৭২০ বর্গফুট) জমির দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা, যা বিসিকের অন্যান্য শিল্পপার্কের তুলনায় অনেক বেশি। উদ্যোক্তারা বলছেন, প্লট বরাদ্দ নিলেই শেষ নয়—নতুন করে কারখানা গড়তে আরও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। অথচ করোনা মহামারি পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শিল্পখাতকে চরম সংকটে ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে পুরোনো বিনিয়োগ ফেলে নতুন শিল্পনগরীতে যাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে বড় বাধা হয়ে। শিল্পনগরী থেকে ঢাকার দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার হলেও পথে ধলেশ্বরীর শাখা নদী পার হতে হয়। ২০১৮ সালে মোল্লাবাজার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও আট বছরেও তা শেষ হয়নি। করোনার সময় কাজ বন্ধ থাকা, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও ঠিকাদার পরিবর্তনের কারণে ২২০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি এখনো কঙ্কালসার। স্থানীয় প্রকৌশল অফিসও জানাতে পারেনি কবে নাগাদ সেতুটির কাজ শেষ হবে। ফলস্বরূপ, উদ্যোক্তারা কারখানার কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য পরিবহনে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সময় ও খরচ উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শিল্পনগরীর ভেতরের অবস্থাও শোচনীয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, ৫০ একর জমির শিল্পপার্কটি এখন অনেকটাই আগাছার রাজত্ব, কোথাও প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু কাঁশবন জন্মেছে। আলাদা আলাদা প্লট তৈরি করা হলেও একটি মাত্র প্লটে ইটের বেষ্টনী দিয়ে কারখানা স্থাপনের কাজ চলতে দেখা গেছে। বাকি প্লটগুলো পড়ে রয়েছে অনাদরে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আল আমিন জানান, কিছু প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শুনেছেন, কিন্তু কারখানা স্থাপন হয়নি। বছরের পর বছর এভাবেই দেখছেন তিনি।
বিসিকের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান স্বীকার করেছেন, প্লট বরাদ্দ দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। উদ্যোক্তারা প্লটের দাম কমানোর দাবি জানালেও এই বিষয়ে বিসিকের কিছু করার নেই বলে জানান তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, জমির দাম অনেক বেশি, এই দামে প্লট বরাদ্দ নিয়ে শিল্প স্থাপন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সংগঠনটি চামড়া শিল্পনগরীর মতো প্লট বরাদ্দে ৮০ শতাংশ ভর্তুকির দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাননি তারা।
শিল্পনগরীটির উদ্দেশ্য ছিল জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান বাড়ানো এবং ১০ হাজার ৬৫০ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু প্লট বরাদ্দের অভাবে সেই লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। বিসিক ইতিমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অনুরোধ জানানোর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে শুধু সেতু নির্মাণই যথেষ্ট নয়, প্লটের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামানো এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করাও জরুরি। অন্যথায় ৩০৯ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প আরও বহুকাল পড়ে থাকবে ভূতুড়ে প্রান্তরের মতো।

