স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইউরোপের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা না গেলে দেশের পোশাক রপ্তানি ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)।
তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর এফটিএ চুক্তি হলে এই সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। র্যাপিডের গবেষণায় বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাড়তি সুবিধা পাবে। এতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের এফটিএ পুরোপুরি কার্যকর হলে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত।
তবে বাংলাদেশ যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করতে সক্ষম হয়, তাহলে পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হতে পারে। সেক্ষেত্রে মোট রপ্তানি কমার হার ১৬ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি কমার হার ১৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে র্যাপিড।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি করবে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যখন শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, তখন এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ একই সুবিধা হারাবে। ফলে বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ইউরোপ-ভিয়েতনাম এফটিএর আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের সব পণ্যে ইইউর শুল্ক পুরোপুরি শূন্যে নেমে আসবে। অন্যদিকে ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর হলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও জুতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে।
বর্তমানে এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে, উত্তরণের পর তা আরও তিন বছর বহাল থাকার সুযোগ রয়েছে। এরপর ইইউ বাজারে নিয়মিত শুল্ক দিতে হবে। যদিও জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবে এর কঠোর শর্তের কারণে তৈরি পোশাক খাতে পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
র্যাপিডের তথ্য বলছে, ইউরোপে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ আসে নিট ও ওভেন তৈরি পোশাক থেকে। বিপরীতে ভারত ও ভিয়েতনামের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য বেশি। দেশ দুটির মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশ মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশের শীর্ষ ১৫টি তুলাভিত্তিক পোশাক পণ্য ইউরোপের বাজারে বড় অংশ দখল করে থাকলেও ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ করে ভিয়েতনামের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চীনা কাপড়ের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ভিয়েতনামও কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কারণ ইউরোপের এফটিএ সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট উৎস-নীতিমালা পূরণ করতে হয়।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইউরোপের সঙ্গে এফটিএ থাকার কারণে ভারত ও ভিয়েতনাম বাংলাদেশের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে এখনো কার্যকর অগ্রগতি করতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যয়ে সুবিধা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের কারণে ভারত থেকে বৈশ্বিক ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে এফটিএর প্রস্তাব দিয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনার কাঠামো ও সরকারের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কেও জানতে চেয়েছে ইউরোপ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার সম্প্রতি জানিয়েছেন, এফটিএ আলোচনা এগিয়ে নিতে হলে বাংলাদেশকে অশুল্ক বাধা কমানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে ইইউ।
র্যাপিড মনে করছে, শুধু এফটিএ নয়, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বাংলাদেশকে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন, লজিস্টিকস এবং কাস্টমস ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। এ ছাড়া ইউরোপের শ্রম, পরিবেশ ও সরবরাহ ব্যবস্থার মানদণ্ড পূরণেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়ে ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ইউরো এবং ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো।
শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি কমে গেলে কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং শ্রমবাজার সুরক্ষায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

