একটি দেশের উন্নয়নের মানদণ্ড নির্ধারণে সাধারণত মাথাপিছু আয়, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মানবসম্পদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে এসব অর্জনের পেছনে যে মূল ভিত্তি কাজ করে, তা হলো গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি। কারণ দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশ শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ, সস্তা শ্রম কিংবা বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি।
তাই উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—গবেষণা ও উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া কি কোনো দেশ সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যেতে পারে? গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। দারিদ্র্য কমানো, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ, নারীর কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে এখন বড় লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন হবে প্রধান চালিকাশক্তি।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির যুগে গবেষণার গুরুত্ব:
একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্রমেই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে। এই অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সম্পদ তেল, গ্যাস বা খনিজ নয়; বরং মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, ওষুধ, মহাকাশ গবেষণা কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে এগিয়ে রয়েছে সেই দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ করে আসছে।
গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি হয়। সেই জ্ঞান থেকেই আসে নতুন প্রযুক্তি, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা। কোনো দেশ যদি নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি করতে না পারে, তাহলে তাকে অন্য দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে প্রযুক্তি আমদানি, রয়্যালটি প্রদান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষণা ও উন্নয়ন (Research and Development—R&D) খাতে বিনিয়োগের সঙ্গে একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যেসব দেশ তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে, তারা সাধারণত উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী শিল্পখাত এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এর বিপরীতে, গবেষণায় পিছিয়ে থাকা দেশগুলো অনেক সময় কেবল শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল থাকে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তাদের নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।
দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা:
গবেষণাভিত্তিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ প্রায়ই সামনে আসে। কয়েক দশক আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশটি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, জাহাজ নির্মাণ ও প্রযুক্তি খাতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
চীনের উন্নয়ন যাত্রাও একই বার্তা দেয়। একসময় কম খরচের উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত দেশটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যান, উচ্চগতির রেল এবং মহাকাশ গবেষণায় বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশ উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে একটি দেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে না। আধুনিক সড়ক, সেতু ও ভবন একটি দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নকে তুলে ধরে, কিন্তু গবেষণা ও উদ্ভাবন তৈরি করে সেই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা।
একটি উন্নত রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার গবেষণাগারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং নতুন ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতায়। তাই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগকে আর বিলাসিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা কোনো দেশের উন্নয়নের পথে চূড়ান্ত বাধা নয়—এটি প্রমাণ করেছে ফিনল্যান্ড, ইসরায়েল ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশ। এসব দেশ দেখিয়েছে, মানুষের মেধা, দক্ষতা ও জ্ঞানকে সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে সীমিত সম্পদ নিয়েও বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
ইসরায়েলকে বিশ্বজুড়ে প্রায়ই “স্টার্টআপ নেশন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর পেছনে শুধু উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ নয়, বরং রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। গবেষণার ফলকে প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার এই সক্ষমতাই দেশটির উদ্ভাবনী শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশে গবেষণার সম্ভাবনা অনেক, তবে বাস্তবে এই খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ সীমিত, আধুনিক গবেষণা অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতাও তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে শিল্পখাতের সঙ্গে একাডেমিক গবেষণার সম্পর্কও এখনো শক্তিশালী হয়ে উঠেনি। এর প্রভাব পড়ছে দেশের মেধাবী গবেষকদের ওপর। অনেকেই উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য বিদেশে যাওয়ার পর দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারান। এতে শুধু মেধা পাচারের প্রবণতাই বাড়ে না, দীর্ঘমেয়াদে দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতাও দুর্বল হয়।
গবেষণাকে অনেক সময় শুধু বিজ্ঞানী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। কৃষিতে নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো প্রযুক্তি, কম খরচের চিকিৎসা ব্যবস্থা, ওষুধ উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর পরিকল্পনা কিংবা জননীতি—সব ক্ষেত্রেই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণার মাধ্যমে তৈরি জ্ঞান যখন কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটিই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। উন্নত দেশগুলোতে এই সমন্বিত কাঠামোকে অনেক সময় Triple Helix Model বলা হয়।
এই ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির ধারণা তৈরি করে, শিল্পখাত তা বাস্তব পণ্য ও সেবায় রূপ দেয় এবং সরকার প্রয়োজনীয় নীতি, অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করে। যেসব দেশে এই তিন পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা শক্তিশালী, সেসব দেশেই উদ্ভাবনের গতি বেশি এবং নতুন শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগও বাড়ে।
বাংলাদেশে অনেক গবেষণা এখনো মূলত গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এসব গবেষণার বাণিজ্যিক ব্যবহার, পেটেন্ট, প্রযুক্তি স্থানান্তর কিংবা শিল্পে প্রয়োগের হার তুলনামূলকভাবে কম অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে তৈরি কোনো নতুন ধারণা যদি উদ্যোক্তা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাতে পারে, তাহলে তা নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কৃষি ও ওষুধ খাতে গবেষণার সাফল্য:
বাংলাদেশের কৃষি খাত গবেষণার ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে। উচ্চফলনশীল ধান, লবণাক্ততা ও খরাসহিষ্ণু ফসল, মাছ ও প্রাণিসম্পদে নতুন প্রযুক্তি—এসব অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গবেষণা।
স্বাধীনতার পর খাদ্যঘাটতির দেশ থেকে বাংলাদেশ যে খাদ্য উৎপাদনে বড় সক্ষমতা অর্জন করেছে, তার পেছনে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে, গবেষণায় বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
ওষুধ শিল্পেও গবেষণার গুরুত্ব স্পষ্ট। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো বর্তমানে বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করছে। তবে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে নতুন ওষুধ, বায়োটেকনোলজি এবং চিকিৎসা প্রযুক্তিতে গবেষণা বাড়াতে হবে।
একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে শুধু আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভর না করে সফটওয়্যার উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং চিপ ডিজাইনের মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি খাতে এগিয়ে যেতে হবে। আর এই অগ্রগতির ভিত্তি হবে গবেষণা।
জাতীয় নিরাপত্তাতেও গবেষণার ভূমিকা:
গবেষণা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশ প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা একটি দেশের কৌশলগত শক্তি বাড়ায়। কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে দেখিয়েছে, সংকট মোকাবিলায় গবেষণা সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যাকসিন উন্নয়ন, রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গবেষণায় এগিয়ে থাকা দেশগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত সাড়া দিতে পেরেছে।
প্রয়োজন গবেষণাবান্ধব পরিবেশ
শুধু গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন একটি কার্যকর গবেষণাবান্ধব পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, গবেষণা অনুদান প্রদানের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং তরুণ গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে গবেষণার ফল যেন নীতিনির্ধারণ ও শিল্পখাতে ব্যবহার করা হয়, সেই সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।
উন্নত দেশগুলোর গবেষণা ব্যয়ের বড় অংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। বাংলাদেশেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণায় উৎসাহিত করতে কর-প্রণোদনা, উদ্ভাবনী তহবিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ গবেষণা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের জন্য গবেষণার সুযোগ সহজলভ্য করতে পারলে দেশে একটি শক্তিশালী উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশ শুধু বড় অবকাঠামো দিয়ে নয়, বরং জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের শক্তিতেই নির্মিত হবে।
গবেষণার ভিত্তি তৈরি করতে হবে শৈশব থেকেই:
একটি শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে এর ভিত্তি তৈরি করতে হবে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই। স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, কোনো সমস্যা বিশ্লেষণ করা এবং নতুন সমাধান খোঁজার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা কখনো জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত গড়ে তুলতে পারে না। কারণ গবেষণা ও উদ্ভাবনের মূল শক্তি হলো কৌতূহল, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। তাই গবেষণাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু শ্রমনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিযোগিতার মূল ক্ষেত্র হবে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং জ্ঞান। যেসব দেশ নতুন প্রযুক্তি ও নতুন ধারণা তৈরি করতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের বাজার ও অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। আর যারা শুধু অন্যের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, তারা মূলত প্রযুক্তির ভোক্তা হিসেবেই থেকে যাবে।
উন্নত রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি গবেষণায়:
উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার ধারণা শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেতু, মহাসড়ক ও আধুনিক ভবন একটি দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নকে তুলে ধরে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নির্ভর করে তার গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবনের পরিবেশের ওপর। অবকাঠামো একটি দেশের বাহ্যিক শক্তি তৈরি করে, আর গবেষণা তৈরি করে সেই দেশের জ্ঞানভিত্তিক ভিত।
২০৪১ সালের লক্ষ্য পূরণে গবেষণাকে অগ্রাধিকার:
বাংলাদেশ যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে গবেষণাকে শুধু শিক্ষা খাতের একটি অংশ হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
গবেষণায় ব্যয় করা অর্থ কোনো খরচ নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং প্রজন্মের সম্ভাবনার ওপর বিনিয়োগ। যে দেশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করে, সে দেশ নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করে। আর যে দেশ গবেষণাকে অবহেলা করে, তাকে অন্যের তৈরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়।
উন্নত রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যেতে হলে এই বাস্তবতা যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাও তত বেশি টেকসই ও অর্থবহ হবে। উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার পথ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব, বড় অবকাঠামোর সংখ্যা কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারিত হয় সে কতটা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে, কতটা উদ্ভাবন করতে পারে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজস্ব সমাধান তৈরি করতে পারে কি না—তার ওপর।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু উন্নত বিশ্বের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারকারী হয়ে থাকব, নাকি নিজেরাই নতুন প্রযুক্তি ও জ্ঞানের উৎস হয়ে উঠব? আমরা কি শুধু অন্য দেশের উদ্ভাবনের বাজার তৈরি করব, নাকি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করব যারা বিশ্বকে নতুন কিছু দিতে পারবে?
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু আজকের অর্জনে নয়, বরং আগামী দিনের জন্য সে কতটা প্রস্তুতি নিচ্ছে তার ওপর। গবেষণায় বিনিয়োগ মানে শুধু গবেষণাগার তৈরি করা নয়; এটি তৈরি করা একটি চিন্তাশীল প্রজন্ম, একটি আত্মনির্ভর অর্থনীতি এবং একটি সক্ষম রাষ্ট্র।
আজ যে দেশ গবেষণায় বিনিয়োগ করছে, আগামী দিনে সেই দেশ প্রযুক্তি ও জ্ঞানের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর যে দেশ এই যাত্রায় পিছিয়ে পড়ছে, তাকে ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে অন্যের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
তাই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—বাংলাদেশ কি শুধু উন্নয়নের গল্প শুনবে, নাকি এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে যেখানে বিশ্বের অন্যরা বাংলাদেশের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের দিকে তাকাবে? কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয় ইট-পাথরে নয়, তৈরি হয় মানুষের চিন্তা, কৌতূহল ও গবেষণার শক্তিতে।
- ড. হারুন রশীদ: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

