দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে একদিকে ডলারের সরবরাহ বাড়ছে, অন্যদিকে কমেছে আগের মতো ডলার কেনার প্রতিযোগিতা। এরপরও গত কয়েক দিনে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম বেড়েছে ৭৫ পয়সা। গত রোববার তা উঠে দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায়। সাড়ে তিন মাস আগের তুলনায় এ দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩০ পয়সা।
ব্যাংকগুলো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮৫ পয়সা পর্যন্ত দরে ডলার কিনেছে। বাজারে সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ না করলেও হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলায় বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি আমদানির দায় পরিশোধসহ কয়েকটি বড় পেমেন্টের কারণে সাময়িকভাবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে।
এ ছাড়া চলতি সময়ে আমদানিতে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ শতাংশ। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ডলারের দাম বাড়ার পেছনে স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির বাইরে কোনো কারণ রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। এ জন্য ব্যাংকগুলোর দৈনিক ডলার লেনদেন, বড় অঙ্কের পরিশোধ এবং নিট ওপেন পজিশন (এনওপি) পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে ডলার লেনদেনে বড় ভূমিকা রাখা ব্যাংকগুলোতে বিশেষ তদারকি টিম পাঠানো হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ডলার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। ব্যাংকগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কেনাবেচা করছে। তবে কোনো ব্যাংক অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সামনে কয়েকটি বড় পরিশোধের সময় থাকায় ডলারের ওপর সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১২১ টাকা থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে ছিল। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে ডলারের দাম সামান্য বাড়তে শুরু করে। ১২ মার্চ আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারের দাম দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এরপর ২৫ জুন পর্যন্ত একই দরে লেনদেন হয়। ২৮ জুন দাম আরও ১০ পয়সা বেড়ে ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় ওঠে। ৯ জুলাই পর্যন্ত এই দাম স্থির থাকার পর আবার বাড়তে শুরু করে ডলারের দর। বর্তমানে আন্তঃব্যাংক দরের তুলনায় আমদানি ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারে ২০ থেকে ২৫ পয়সা বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বড় কিছু পরিশোধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির গতি আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে রপ্তানি কমলেও আমদানি বাড়ছে। এসব কারণে ডলারের দামে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
আইএমএফের সঙ্গে বিদ্যমান ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে।
সফরে অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সংস্থাটি। আলোচনায় বিনিময় হারকে আরও বাজারভিত্তিক করা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের মতো বিষয় উঠে আসে।
২০২১ সালের আগে দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের দাম প্রায় ৮৪ টাকায় স্থির ছিল। তবে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ধীরে ধীরে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে তা ১২২ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ পাচারে কড়াকড়ি এবং হুন্ডি নিয়ন্ত্রণের কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।
তবে আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। ফলে রপ্তানি, আমদানি ও বড় পরিশোধের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করেই এখন ডলারের বাজারের গতি নির্ধারিত হচ্ছে।

