ওষুধের মূল্য নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতার কারণে দেশের ওষুধ শিল্পে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। নতুন ওষুধ উৎপাদনের প্রস্তুতি থাকলেও বাজারজাত করার অনুমোদন না পাওয়ায় আটকে আছে শত শত পণ্য। এতে একদিকে আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা, অন্যদিকে বিপুল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশীয় ওষুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই সংকটের কারণে নতুন ওষুধের উন্নয়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারখানার আধুনিকায়নে করা বিনিয়োগের সুফল পাচ্ছে না কোম্পানিগুলো। একই সঙ্গে বিশ্বমানের নতুন চিকিৎসা দেশে সহজলভ্য হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে আছে।
ওষুধ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শতাধিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তৈরি কয়েক হাজার নতুন ওষুধ বর্তমানে মূল্য নির্ধারণ ও বাজারজাতকরণের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব ওষুধের মধ্যে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হাঁপানি, বন্ধ্যাত্ব, জটিল সংক্রমণসহ বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধও রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগীদের চিকিৎসার সুযোগের ওপরও।
আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধও আটকে:
দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার অন্যতম উদাহরণ হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা ‘নিভোলুম্যাব’ (Nivolumab)।
প্রতিষ্ঠানটি দেশে ব্যবহারের জন্য এই ইমিউনোথেরাপির দুটি ডোজ তৈরি করেছে। এর একটি ৪০ মিলিগ্রাম/৪ মিলিলিটার এবং অন্যটি ১০০ মিলিগ্রাম/১০ মিলিলিটার। মেলানোমা, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, পাকস্থলী ও কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন উন্নত পর্যায়ের ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে এই ওষুধ ব্যবহৃত হয়।
তবে দেশে উৎপাদিত হলেও এখনো বাজারে আসতে পারেনি ওষুধটি। কারণ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) এর মূল্য অনুমোদন এবং বাজারজাতকরণের চূড়ান্ত অনুমতি দেয়নি। ওষুধ কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের বিলম্বের কারণে নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি দেশের রোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। একই সঙ্গে গবেষণা ও উৎপাদনে করা বড় অঙ্কের বিনিয়োগও আটকে যাচ্ছে।
একাধিক ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি এখন আর শুধু শিল্পের সমস্যা নয়; এটি রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তারা দ্রুত জমে থাকা আবেদন নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার দাবি জানিয়েছেন।
আদালতের নির্দেশের পর বেড়েছে জটিলতা:
ওষুধের মূল্য অনুমোদনে বিলম্বের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) করা একটি রিটের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জীবনরক্ষাকারী সব ওষুধের মূল্য সরকারকে নির্ধারণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ‘ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’-এর আওতায় মূল্য নির্ধারণে ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে ওষুধ উৎপাদকদের দাবি ছিল, একতরফাভাবে মূল্য নির্ধারণ না করে উৎপাদকদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে দাম ঠিক করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তারা আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলও করে। এরপর থেকেই নতুন ওষুধের মূল্য অনুমোদন কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করছে কোম্পানিগুলো। তাদের ভাষ্য, সরকারি অনুমোদিত মূল্য ছাড়া আইনগতভাবে কোনো ওষুধ বাজারে ছাড়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাকির হোসেন বলেন, আগে কিছু ওষুধের মূল্য নির্ধারণে দেরি হলেও আদালতের নির্দেশের পর প্রায় সব নতুন ওষুধের ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়া থেমে গেছে। তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি ইতোমধ্যে ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কেউ কেউ পণ্য তৈরি করেও রেখেছে। কিন্তু মূল্য অনুমোদন না থাকায় সেগুলো রোগীদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

