দেশের ‘ফলের রাজা’ আম এখন শুধু স্বাদের জনপ্রিয় ফল নয়, এটি পরিণত হয়েছে বড় একটি অর্থনৈতিক খাতে। চাষাবাদ থেকে শুরু করে সংগ্রহ, পরিবহন, প্যাকেজিং, বিপণন ও রপ্তানি—সব মিলিয়ে আমকে ঘিরে তৈরি হয়েছে হাজার কোটি টাকার কর্মসংস্থান ও ব্যবসা।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে ৫ লাখ ৪ হাজার একর জমিতে আম চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের আমভিত্তিক অর্থনীতির আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর নতুন করে অনেক কৃষক আম চাষে যুক্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারাও আধুনিক পদ্ধতিতে আমের বাগান গড়ে তুলছেন। ফলে বাড়ছে উৎপাদন, বিস্তৃত হচ্ছে বাজার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে যে পরিমাণ জমিতে আম চাষ হয়েছে, তার প্রায় ৬৮ শতাংশেই রয়েছে উন্নত জাতের আমের বাগান। দেশের জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ল্যাংড়া, হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি, গোপালভোগ, বারি-৪, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙা ও ফজলি।
কৃষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে আম উৎপাদন হয়েছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ লাখ ৬২ হাজার টনে। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে দেশের আম উৎপাদন।
এ বছর আমের বাজারদর নিয়েও সন্তুষ্ট চাষিরা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জাত ও মানভেদে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আম বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৮০ টাকায়। পাইকারি বাজারে দাম ৬০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। তবে নওগাঁর সাপাহারের চাষিরা জানিয়েছেন, উন্নত মানের আম্রপালি আম প্রতি কেজি ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। আর বারি-৪ জাতের আম বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০০ টাকায়।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কয়েক বছর আগেই দেশে বছরে আম বিক্রির বাজার ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। উৎপাদন ও চাহিদা বাড়ায় এবার এ বাজার আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় আম ঘিরে বড় অর্থনীতি:
আম উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট আমবাজার দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজারগুলোর একটি। এছাড়া শিবগঞ্জ পাকা আমবাজার, রহনপুর, সদরঘাট ও ভোলাহাট বাজারেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আম কেনাবেচা হয়।
কানসাট আম আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু জানান, কানসাট ও শিবগঞ্জ পাকা আমবাজার মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আম লেনদেন হচ্ছে। এসব বাজার থেকে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক আম দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক বুলবুল আহম্মেদ জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আমকে কেন্দ্র করে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে আম উৎপাদনে দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর একটি নওগাঁ। জেলার সাপাহার, পোরশা, পত্নীতলা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় আমভিত্তিক ব্যবসা সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। সাপাহারের কৃষক সোহেল রানা চলতি মৌসুমে ৭০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। তাঁর উৎপাদিত আম যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, ইতালি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে রপ্তানি হয়েছে। তিনি জানান, এ মৌসুমে তাঁর আম বিক্রি দেড় কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
গত বছর নওগাঁয় আমকেন্দ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা, এবার তা ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। শেষ সময়ে ভালো দামে আম বিক্রি করতে পারায় কৃষকেরাও লাভবান হচ্ছেন।
রপ্তানি বাড়ছে, তবে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ:
দেশ থেকে চলতি বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৯০০ টন আম রপ্তানি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পুরো মৌসুমে রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার ৩০০ টনে পৌঁছাতে পারে।
এ বছর সবচেয়ে বেশি আম গেছে যুক্তরাজ্যে। দেশটিতে প্রায় ৫০০ টন আম রপ্তানি হয়েছে। এছাড়া ইতালি ও সৌদি আরবে গেছে প্রায় ২৫০ টন করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সুইডেন, জার্মানি, মালদ্বীপ ও ফ্রান্সেও রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশের আম। ২০২৫ সালে দেশ থেকে প্রায় ২ হাজার ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল।
ইউরোপে আম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, চলতি মৌসুমে তাঁর প্রতিষ্ঠান ইউরোপের তিনটি দেশে ১০ টনের বেশি আম পাঠিয়েছে। তবে বিমানভাড়া বেশি হওয়া এবং ঢাকার বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত কুলিং সুবিধার অভাবে রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে।
ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম অবস্থানে থাকলেও রপ্তানিতে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বছরে এক লাখ টনের বেশি আম রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হলে আমের মান, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আমদানিকারক দেশের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আম চাষ এখন অনেক কৃষকের জন্য লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেক ফল নষ্ট হয়। তিনি বলেন, আমের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করতে হলে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, উন্নত প্যাকেজিং এবং রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশে আমের উৎপাদন বাড়লেও এখনো সীমিত পরিমাণে বিদেশ থেকে আম আমদানি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত দেশে প্রায় ৩৭ টন আম আমদানি হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে আম আমদানির পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল ১ হাজার ৩৪৩ টন। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তা কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ৮৭ টনে।
আম আমদানিকারকদের মতে, সাধারণত মৌসুম শেষ হওয়ার পর উন্নত জাতের আমের চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকে আম আনা হয়। তবে দেশে এখন বারোমাসি আমের উৎপাদন বাড়ায় আমদানির প্রয়োজন কমছে।

