দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দুই দেশ কি কথার জায়গা পেরিয়ে বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানে যেতে পারবে? সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ধারাবাহিক বৈঠক ও বার্তায় ঢাকা-দিল্লি উভয় পক্ষই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা এসেছে। এর পাশাপাশি ভারতীয় পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ এবং সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছে।
তবে সম্পর্কের এই নতুন উদ্যোগকে শুধু সৌজন্য বিনিময় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। গত দুই বছরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ দুই দেশের সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর ঢাকার ক্ষোভ আবারও সামনে আসে এবং বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের বিষয়টি জোর দিয়ে তোলে। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি তারা তাদের আইনগত কাঠামোর মধ্যে পর্যালোচনা করছে। ফলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা শুরু হলেও রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়গুলো এখনো দুই দেশের কূটনীতির কেন্দ্রে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে গঙ্গার পানি চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছরের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। অর্থাৎ দুই দেশের হাতে নতুন চুক্তি বা সমঝোতার কাঠামো তৈরি করার জন্য সময় খুব বেশি নেই। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে ভারতের ইতিবাচক ভূমিকার প্রত্যাশা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন দশক আগের বাস্তবতার ওপর তৈরি কাঠামোকে শুধু একইভাবে নবায়ন না করে জলপ্রবাহের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর পরিবেশগত বাস্তবতাও নতুন আলোচনায় বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তা ও অন্য অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, পানি ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু রাজনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, নদীর নাব্যতা, জীবিকা এবং জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই নতুন করে সম্পর্ক গড়তে হলে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনকে আরও কার্যকর করা এবং নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যাওয়া জরুরি। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি সেই আলোচনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও তৈরি করেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতিও সম্পর্কের আস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। চলতি বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বৈঠকে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ পারাপারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ এবং জোরপূর্বক মানুষ পাঠানোর অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। জাতিসংঘও দুই দেশকে সংলাপের মাধ্যমে এবং মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে এসব সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা যতই ইতিবাচক হোক, সীমান্তে বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সাধারণ মানুষের কাছে সেই পরিবর্তনের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা কঠিন হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বড় হলেও বিভিন্ন পণ্যে আমদানি-রপ্তানি বিধিনিষেধ, স্থলবন্দরকেন্দ্রিক জটিলতা এবং বাজারে প্রবেশের বাধা ব্যবসার খরচ বাড়ায়। ২০২৫ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশি কিছু পণ্যের স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে দুই দেশের বাণিজ্যপথে প্রভাব পড়েছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন উদ্যোগ সফল হলে এই ধরনের বাধা কমানো, বাণিজ্য সহজ করা এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমানো দুই দেশের ব্যবসার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখানেই সম্পর্কের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের জন্য ভারত শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়; এটি বড় একটি সরবরাহকারী বাজার, গুরুত্বপূর্ণ স্থলবাণিজ্য অংশীদার এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাণিজ্য, পরিবহন, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রগুলোকে আলাদা করে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক দুই দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও অনিশ্চয়তা কমাতে পারে।
তবে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, দুই দেশের মধ্যে নতুন করে যোগাযোগের জানালা খুলেছে। ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, ব্রিকস আউটরিচে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু, গঙ্গার পানি চুক্তি, তিস্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক বাধার মতো কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা প্রয়োজন।
সবশেষে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে কে কতটা বড় কূটনৈতিক বক্তব্য দিলেন তার ওপর নয়; বরং সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা বাস্তবে কী পরিবর্তন দেখছেন তার ওপর। সীমান্তে উত্তেজনা কমছে কি না, নদীর পানির বিষয়ে কার্যকর সমঝোতা হচ্ছে কি না, পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হচ্ছে কি না, দুই দেশের ব্যবসায়ীরা নতুন সুযোগ পাচ্ছেন কি না, এসবই হবে সম্পর্কের বাস্তব মাপকাঠি। প্রতিবেশী বদলানোর সুযোগ নেই; তাই দুই দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সামলানো হবে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সেই পথের দরজা খুলেছে, এখন পরীক্ষাটি বাস্তবায়নের।

