বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বড় একক বাজার। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক সামগ্রী ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতের বিপুল পরিমাণ পণ্য প্রতি বছর দেশটিতে রফতানি হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে ১০ শতাংশ শুল্ক খুব বেশি মনে না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বৈশ্বিক রফতানি বাজারে অনেক সময় মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ মূল্য পার্থক্যই কোনো দেশের পক্ষে বা বিপক্ষে ক্রয়াদেশ চলে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই বাস্তবতায় অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করতে পারে।
কেন এই শুল্ক আরোপ করা হলো?
মার্কিন প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অনেক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বা সেসব পণ্যের কাঁচামালের আমদানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা পাচ্ছে এবং মার্কিন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ছে।
নতুন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে। একই তালিকায় রয়েছে ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকোসহ আরও কয়েকটি দেশ। অন্যদিকে চীন ও ভিয়েতনামসহ ৩৮টি দেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। আর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার। প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।
নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ব্যয় বাড়বে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক পরিশোধ করেন দেশটির আমদানিকারকরা, তবে অতিরিক্ত খরচের প্রভাব অনেক সময় সরবরাহকারীদের ওপরও পড়ে। ফলে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ নিতে হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে একদিকে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাভ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, অন্যদিকে মার্কিন ক্রেতারা কম খরচের বিকল্প সরবরাহকারীর সন্ধান করতে পারেন। এর ফলে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে।
নতুন শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রফতানি খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে। তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক শুল্ক কাঠামোর অংশ নয়। বরং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা অতিরিক্ত শুল্ক, যা বিভিন্ন দেশের ওপর ধাপে ধাপে চাপানো হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্যে পড়ছে এবং বাংলাদেশের রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের একটি অংশ বাংলাদেশের কাঁচামাল আমদানির উৎস দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব দেশের কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখ করেছে। তবে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা যেসব দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন, সেসব দেশের শ্রম পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন নতুন এই অতিরিক্ত শুল্ক শিল্পের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এতে রফতানি প্রতিযোগিতা কমার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে পোশাক খাতে:
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মূলত প্রতিযোগিতামূলক দামের ওপর নির্ভর করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। কিন্তু নতুন শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বিকল্প সরবরাহকারী দেশের দিকে যেতে পারে।
বিশেষ করে যেসব ব্র্যান্ড একাধিক দেশ থেকে একই ধরনের পণ্য সংগ্রহ করে, তারা নতুন করে সরবরাহ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের বাজার ধরে রাখতে আরও কৌশলী হতে হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কারণ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনামের ওপর বাংলাদেশের তুলনায় বেশি, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে পড়বে না।
তবে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশের রফতানি খাতকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
শুধু পোশাক নয়, ঝুঁকিতে পড়তে পারে আরও কয়েকটি রফতানি খাত:
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতির প্রভাব শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক পণ্য, কৃষিপণ্য, হিমায়িত মাছ, সাইকেল এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের মতো রফতানি খাতও এর প্রভাবে চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব খাতে মুনাফার পরিমাণ তুলনামূলক কম, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত শুল্ক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে এসব খাতকে মূল্য কমানো, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ অথবা বাজার হারানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের অন্যতম কারণ হিসেবে জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়টি সামনে আনা হলেও বাংলাদেশ সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। তাদের দাবি, বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো চর্চা নেই।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বেশি পর্যবেক্ষণ করা শিল্প। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন নিরীক্ষা সংস্থার নিয়মিত তদারকির কারণে এ খাতে শ্রম পরিবেশ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে বলে দাবি করছেন উদ্যোক্তারা।
তাদের মতে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যেসব দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়, তাদের পরিস্থিতির দায় বাংলাদেশের রফতানিকারকদের ওপর চাপানো যৌক্তিক নয়।
বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সমীকরণ:
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি শুল্ক বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি অংশ। আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার প্রধান বিষয় ছিল উৎপাদন খরচ ও শুল্ক সুবিধা। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা অর্থাৎ ভবিষ্যতে শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদন করলেই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা যাবে না। একই সঙ্গে পূরণ করতে হবে বৈশ্বিক মানদণ্ড ও ক্রেতাদের নতুন চাহিদা।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, নতুন শুল্ক ব্যবস্থাকে তিনি ‘পুরোনো মোড়কে নতুন মিষ্টি’ হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, গত কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশের পণ্যের ওপর কার্যত ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে মূলত সেটিকে ভিন্ন আইনি কাঠামোর আওতায় কার্যকর করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শুল্ক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।
তবে তিনি মনে করেন, নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য কিছু ইতিবাচক সুযোগও তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার ১০ শতাংশ। ফলে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেতে পারে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু কম দামে পণ্য রফতানির ওপর নির্ভর করলে হবে না। পরিবর্তিত বাজার চাহিদা, ক্রেতাদের পছন্দ এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তুলা ও কিছু কাঁচামালের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের জন্য শুল্ক সুবিধার একটি কাঠামো বিবেচনা করছে। সেখানে বাংলাদেশের নাম থাকলেও ভারত ও ভিয়েতনামের নাম নেই বলে জানা যাচ্ছে। বিষয়টি চূড়ান্ত হলে এটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে।
সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ:
আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মহিউদ্দিন রুবেল। তার মতে, উৎপাদন দক্ষতা, পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রফতানি খাত বর্তমান সুযোগগুলো আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। এর প্রভাব ভোক্তার ক্রয় আচরণ, পণ্যের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্তেও পড়তে পারে। তাই বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি খাত নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের রফতানিকারকদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। একই সঙ্গে শ্রমমান, উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক বাজারে এখন শুধু পণ্যের দাম নয়, উৎপাদনের পদ্ধতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মতো একক বড় বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ নতুন সম্ভাবনাময় বাজারে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে আরও সক্রিয় যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে যে বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো চর্চা নেই। দেশের শ্রম আইন বাস্তবায়ন, শ্রম পরিবেশের উন্নয়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের উদ্যোগগুলোও বিশ্ব দরবারে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব পড়তে পারে:
স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক বাংলাদেশের রফতানি ব্যয় বাড়াতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ম দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই হবে না। শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, উৎপাদনের স্বচ্ছতা এবং টেকসই শিল্প ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ নতুন সুযোগে পরিণত হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের রফতানি খাতে বড় ধাক্কা না দিলেও বিষয়টিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ এটি শুধু একটি শুল্ক বৃদ্ধির ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে শ্রমমান উন্নয়ন, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এবং নতুন বাজার খোঁজার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে দেরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ রফতানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

