সরকারের ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজধানীর দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রাক্কলন থেকে প্রায় চার হাজার আটশ কোটি টাকা কমানো হচ্ছে। লাইন-১ এবং লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প দুটির সংশোধিত প্রস্তাব পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন পরিকল্পনা কমিশনের একজন অতিরিক্ত সচিব। কমিটি আজ থেকেই তাদের কার্যক্রম শুরু করছে।
রোববার বিমানবন্দর-কমলাপুর রুটের লাইন-১ এবং হেমায়েতপুর-ভাটারা রুটের লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই এই ব্যয় হ্রাসের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
২০১৯ সালে যখন প্রকল্প দুটি অনুমোদিত হয়েছিল, তখন সম্মিলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে পাঠানো সংশোধিত প্রস্তাবে এই ব্যয় বাড়িয়ে দুই লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। এত বড় অঙ্কের বৃদ্ধি দেখে পরিকল্পনা কমিশন বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
পর্যালোচনা সভায় বিভিন্ন প্যাকেজ যাচাই করে লাইন-১ থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা এবং লাইন-৫ নর্দার্ন থেকে প্রায় আটশ কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির বিস্তারিত পর্যালোচনার পর ব্যয় আরও কমতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দরপত্রে প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি দর প্রস্তাব আসায় গত দেড় বছর ধরে প্রকল্প দুটির কাজ কার্যত থমকে ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া এই বিলম্ব পরবর্তীতেও চলতে থাকে, যার ফলে কর্তৃপক্ষ পুরো ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নতুন করে যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার প্রকল্প দুটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী এবং চায় দ্রুত অনুমোদন দিয়ে বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই অন্তত আংশিক কাজ শুরু করতে।
২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রায় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদন পেয়েছিল লাইন-১ প্রকল্পটি। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলতি মাসে বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রায় ১৩০ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে এক লাখ ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সমাপ্তির সময়সীমা ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্যে একাধিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে সংশোধিত প্রস্তাবে। মূলত বিস্তারিত নকশা তৈরির সময় আনা কাঠামোগত পরিবর্তন, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া এবং ঠিকাদারদের প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি দর দেওয়াকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০১৮ সালের প্রাথমিক নকশার ভিত্তিতে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলেও পরবর্তীতে বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর নির্মাণকাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
যেমন, মাটির নিচে দেয়াল নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠামোর সর্বোচ্চ পুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে প্রায় দেড় গুণ, আর স্টেশনের নিচের গভীরতাও প্রায় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি স্টেশনের দৈর্ঘ্য ও বাতাস চলাচলের পথের অবস্থানও পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক এবং প্রায় চার কিলোমিটার বাড়তি রেললাইনও যুক্ত হয়েছে পরিকল্পনায়।
ডলারের বিনিময় হারের প্রভাবও কম নয়—২০১৯ সালে যেখানে প্রতি ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৬ টাকা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৩ টাকায়। এই বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেই তদারকি পরামর্শক খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। শুরুতে এই খাতে যে জনশক্তি ও অর্থ বরাদ্দ ছিল, পরবর্তীতে তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হয়েছে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রথমবারের মতো মাটির নিচে মেট্রোরেল নির্মাণ করায় ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন ঠিকাদাররা। এই কারণে দরপত্রে তারা বাড়তি ঝুঁকি ব্যয় যুক্ত করেছেন, যা সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া বহিরাগত জনবল নিয়োগ খাতেও ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত কাজ এগিয়েছে মাত্র সাড়ে সাত শতাংশের কাছাকাছি, আর আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা, যা প্রস্তাবিত সংশোধিত ব্যয়ের মাত্র সোয়া তিন শতাংশ। মোট প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটের প্রায় ২০ কিলোমিটার বিমানবন্দরমুখী অংশ সম্পূর্ণ মাটির নিচ দিয়ে যাবে, বাকি অংশ পূর্বাচলমুখী রুটে আংশিক ভূগর্ভস্থ ও আংশিক উড়ালপথে নির্মিত হবে।
২০১৯ সালে প্রায় ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরে অনুমোদিত হয়েছিল লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্প। সংশোধিত প্রস্তাবে এই ব্যয় প্রায় ১২৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট ২০২৮ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য থাকলেও এখন যাত্রীসেবা শুরুর নতুন সময় ধরা হয়েছে ২০৩৩ সালের জানুয়ারি।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উচ্চ বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন, ডিপো সম্প্রসারণ ও আমদানি করা যন্ত্রপাতির মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়েছে। ডলারের দাম বাড়ায় বিদেশ থেকে আনা রেল ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক ব্যবস্থা, রেল প্রযুক্তি ও বিদেশি পরামর্শক সেবার খরচও বেড়ে গেছে।
মূল পরিকল্পনার সময় মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার শতাংশ, যা এখন বেড়ে দশ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি হারে, যার প্রভাব পড়েছে নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ কাজ, বিভিন্ন সেবা লাইন স্থানান্তর ও ডিপো উন্নয়নের ব্যয়ে।
নকশায় আনা পরিবর্তনও ব্যয় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। প্রাথমিক সমীক্ষার তুলনায় চূড়ান্ত নকশায় ভূগর্ভস্থ স্টেশনগুলোর গভীরতা ও গঠনে যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে হয়েছে। বিশেষত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের গভীরতা যথাক্রমে প্রায় ১৫ মিটার ও সাত মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে খনন ও নির্মাণ ব্যয় বহুগুণে বেড়েছে। প্রায় সব স্টেশনের গভীরতা ও দৈর্ঘ্য বাড়ানোর ফলে সার্বিক ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া রেলযান রাখার ডিপোর আয়তনও প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে, যার কারণে ভূমি উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও সড়ক নির্মাণেও বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সুড়ঙ্গ খননের সময় আশপাশের স্থাপনার সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ বাবদ বাড়তি অর্থও সংস্থান রাখতে হয়েছে।
রেলযান ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, ভূমি অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়াতেও বাড়তি ব্যয় যুক্ত হয়েছে। জনবহুল এলাকায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে সময় ও সমন্বয়জনিত জটিলতাও ব্যয় বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটের প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার থাকবে মাটির নিচে, বাকি সাড়ে ছয় কিলোমিটার থাকবে উড়ালপথে। পুরো পথে মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে নয়টি হবে ভূগর্ভস্থ ও পাঁচটি উড়াল স্টেশন। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা, যা মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় সাড়ে নয় শতাংশ, আর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দুটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এখন বাস্তবসম্মত পর্যায়ে ব্যয় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। বিনিময় হারের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং জটিল নগর অবকাঠামোর বাস্তবতা—এই তিনটি বিষয় প্রকল্প দুটির ব্যয় নির্ধারণে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের পরই স্পষ্ট হবে, শেষ পর্যন্ত কত ব্যয়ে এবং কবে নাগাদ রাজধানীবাসী এই দুটি মেট্রোরুটের সুফল পেতে যাচ্ছেন।

