বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছিল, তা এখন ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তৈরি করা নতুন বিনিয়োগ পাইপলাইনের আওতায় সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ। এর মধ্যে প্রায় ৩৬৭ মিলিয়ন ডলার বা ৯২ শতাংশই এসেছে চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
বিডার জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিনিয়োগ মূলত উচ্চমানের বস্ত্র, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন খাতে হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্পখাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
বিডা জানায়, ২০২৫ সালে সংস্থাটি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি করেছিল। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০টি দেশের প্রায় ৭০ জন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর প্রস্তাব যাচাই করা হয়। এর মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি প্রকল্প ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। বিডার দাবি, এই হার আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত বিনিয়োগ বাস্তবায়নের গড় হারের তুলনায় ভালো।
এদিকে ২০২৬ সালের জন্যও নতুন করে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরির কাজ চলছে। এরই মধ্যে ২৬৪টি নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিডা।
হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বড় প্রকল্প:
চলমান বিনিয়োগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হংকংভিত্তিক হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রাথমিক ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা স্মারক বাড়িয়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে।
প্রকল্পটির আওতায় দুই ধাপে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম ধাপে মিরসরাইয়ে ৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপন করা হবে। পরবর্তী ধাপে কেরানীগঞ্জে ২২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গড়ে উঠবে সমন্বিত টেক্সটাইল কমপ্লেক্স। বিডার মতে, এই প্রকল্পে উন্নত বস্ত্র প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের কাপড় উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে দেশের পোশাক খাতের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং রপ্তানি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
স্বয়ংক্রিয় টেক্সটাইল কারখানায় চীনা বিনিয়োগ:
চীনের হেংলি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান লিড বাংলাদেশ টেক্সটাইল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় টেক্সটাইল কারখানা স্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি দেশের পোশাকশিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনে চায়না লেসোর উদ্যোগ:
চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান চায়না লেসো গ্রুপ চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারখানাটিতে পিভিসি ও পিইএক্স পাইপ, সৌর প্যানেল, স্যানিটারি পণ্য, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, দরজা-জানালা, পানি পরিশোধন যন্ত্র, কেবল, আলোকসজ্জা সামগ্রী এবং অগ্নিনিরাপত্তা পণ্য উৎপাদন করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নির্মাণসামগ্রীর আমদানি নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, চীনা বিনিয়োগ শুধু অর্থায়ন নয়, এর সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি এবং বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগও নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীন ও হংকং থেকে বাংলাদেশে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এর পরিমাণ যুক্তরাজ্যের ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। একই সময়ে সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার।

