একসময় ঘরের দেয়ালে রং করা মানেই ছিল উৎসব বা বিশেষ উপলক্ষে সাদা কিংবা অফ-হোয়াইট চুনকামের প্রচলিত ধারা। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের রুচি, জীবনযাত্রা এবং বাসস্থান নিয়ে ভাবনা। এখন ঘর শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং ব্যক্তিগত পছন্দ, নান্দনিকতা ও আধুনিক জীবনধারার প্রতিফলন। এই পরিবর্তনের প্রভাবেই বাংলাদেশের রংশিল্প গত কয়েক বছরে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের রঙের বাজারের আকার ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। অথচ ২০২০ সালে এই বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে শিল্পটি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের উচ্চ মূল্য, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং বাড়তি শুল্কের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তবুও আবাসন খাতের সম্প্রসারণ, পুরোনো ভবনের সংস্কার এবং আধুনিক জীবনযাত্রার প্রসারের কারণে শিল্পটি এখনো ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশের রংশিল্পের সূচনা স্বাধীনতারও আগে। দেশের অন্যতম পুরোনো দেশীয় ব্র্যান্ড এলিট পেইন্টের বর্তমান ব্র্যান্ড এ্যাকোয়া পেইন্টসের পরিচালক শায়ান সিরাজ জানান, ১৯৫২ সালে দেশে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় আধুনিক স্থাপত্যে ব্যবহৃত রঙের পরিবর্তে মূলত নৌকায় ব্যবহারের জন্য আলকাতরা বিক্রি হতো। তাঁর ভাষ্য, সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশের রঙের বাজার বছরে গড়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালে বাংলাদেশের রং ও প্রলেপের বাজারের মূল্য প্রায় ২২৭ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মাথাপিছু রঙের ব্যবহার এখনো খুবই কম। দেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে ২ কেজিরও কম রং ব্যবহার করেন। অথচ ভারতে ও শ্রীলঙ্কায় এই পরিমাণ ৩ কেজির বেশি। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে মাথাপিছু ব্যবহার ৭ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দেয় যে দেশে মানসম্মত আবাসন ও উন্নত রং ব্যবহারের বাজার এখনো অনেক বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রংশিল্পের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন খাতের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নতুন ভবন নির্মাণের শেষ ধাপেই প্রয়োজন হয় রং ও ফিনিশিংয়ের। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য বলছে, নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় নতুন ফ্ল্যাট বুকিংয়ে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিলেও নির্মাণাধীন প্রকল্প হস্তান্তরের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া পুরোনো ভবন সংস্কার ও নতুন ফ্ল্যাটে রং করার চাহিদা অব্যাহত থাকায় রঙের বাজারে বড় ধরনের মন্দা তৈরি হয়নি।
রং কেনার ধরণেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন ক্রেতারা শুধু একটি রঙের টিন কিনেই সন্তুষ্ট নন। তাঁরা চান দীর্ঘস্থায়ী, নিরাপদ ও মানসম্মত সমাধান। দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহসিন হাবিব চৌধুরীর মতে, গ্রাহকদের মধ্যে এমন রঙের চাহিদা বাড়ছে যা সহজে পরিষ্কার করা যায়, ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং দেয়ালে ছত্রাক জন্মাতে দেয় না। এই চাহিদা পূরণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি ও সেবা চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- কম্পিউটারভিত্তিক কালার টিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজারো রঙের শেড থেকে তাৎক্ষণিক নির্বাচন।
- এক্সপেরিয়েন্স জোন ও রঙ পরামর্শসেবা।
- টেক্সচার, আর্ট ফিনিশ ও মেটালিক ফিনিশের মতো আধুনিক রঙের সমাধান।
রঙের বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে ৬১ শতাংশের বেশি ব্যবহারকারী এখন ওয়াটার-বেজড ও টেকসই রং ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো সিসামুক্ত, কম উদ্বায়ী জৈব যৌগযুক্ত (লো-ভিওসি), অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং গন্ধহীন রং উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
রংশিল্পের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা। টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড, রেজিন, পিগমেন্ট, সলভেন্ট এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত রাসায়নিকের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহসিন হাবিব চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রঙের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হওয়া এবং শুল্কের আওতা বাড়ানোর ফলে প্রস্তুতকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এসব কারণে বাজারে চাহিদা কিছুটা ধীর হলেও উৎপাদকরা নিজেদের মুনাফা কমিয়ে খুচরা বাজারকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশের রঙের বাজারে বার্জার ও এশিয়ান পেইন্টসের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এলিট, এ্যাকোয়া, রেইনবো, রক্সি এবং প্যাকটি পেইন্টের মতো দেশীয় ব্র্যান্ডও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, দেশীয় শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-সুবিধা, নীতিগত সহায়তা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের রংশিল্প শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

