দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, ধারাবাহিকভাবে কমছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। একই সঙ্গে শিল্প খাতে দেখা দিয়েছে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ শতাংশ ধরা হলেও তা অর্জন নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের সংশয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন হবে। এরপর প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর পূর্বাভাসেও বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে। আর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে হয়েছে ২ দশমিক ২২ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে শিল্প খাতে। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শিল্প খাতে উৎপাদন কমেছে।
সংকটে শিল্প খাত:
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, শিল্প খাত বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
তার মতে, কাজের অর্ডার কমে যাওয়া এবং আর্থিক সংকটের কারণে গত দুই বছরে ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্প খাতের চাপ আরও বেড়েছে। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শিল্প খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে দেশে নতুন বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশে নেওয়া কঠিন।
আইএমএফ জানিয়েছে, বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব ঘাটতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং মূল্যস্ফীতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এসব চাপ আরও বেড়েছে। সংস্থাটির মতে, সংঘাতের প্রভাবে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সমস্যার কারণে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে হয় ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২২ শতাংশে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। আন্দোলন, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পরও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিল্প খাতে চাপ এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
রাজস্ব ঘাটতি ও বিনিয়োগ সংকট:
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, অর্থনীতি দুর্বল থাকা অবস্থায় বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, গত অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমেছে। তার মতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত।
গত অর্থবছরের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যায়। শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের গতিও কমেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, বরং বেকারের সংখ্যা বেড়েছে।
বিবিএসের সাময়িক হিসাবে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে প্রকৃত হিসাব আরও কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, অতীতেও বিবিএসের সাময়িক হিসাবের তুলনায় চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। তাই বর্তমান প্রাক্কলনও পরিবর্তিত হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একটি দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা বোঝার অন্যতম সূচক হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধি। পরপর তিনবার প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া অর্থনীতির দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে আবার ৭ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে নিতে সময় লাগবে। এজন্য বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

