বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ সময়, বন্দরজট, গ্যাস সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, জটিল করব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদনের জটিলতায় অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এমন চিত্র তুলে ধরেছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই)।
সংস্থাটির প্রকাশিত “FDI for a New Bangladesh: Roadmap for a $15 Billion Vision” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে—ব্যবসা শুরু, পরিচালনা, সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া পর্যন্ত—বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় বিনিয়োগ পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। পাশাপাশি নীতিগত অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত ঘাটতি, বন্দর ও লজিস্টিকস সমস্যা, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দক্ষ জনশক্তির সংকট, জটিল করব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আস্থার ঘাটতি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এফআইসিসিআই জানায়, কাগজে-কলমে ব্যবসার প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে ৭৬ দিন সময় লাগার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। জমির মালিকানা হস্তান্তরেও গড়ে ২৬০ দিন সময় প্রয়োজন হয়, যা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়।
বন্দর ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার খালাসে যেখানে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে, সেখানে ভিয়েতনামে একই কাজ শেষ হয় মাত্র ৩ থেকে ৪ দিনে।
জ্বালানি সংকটও বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি, অথচ সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৫৮০ এমএমসিএফডি।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বল অবস্থাকেও অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে এফআইসিসিআই। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একটি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসায়ীদের ২৩টি সরকারি সংস্থার বিভিন্ন ধরনের অনুমোদন নিতে হয়। দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতিও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা। বৈশ্বিক দক্ষতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০ দেশের মধ্যে ৯৬তম। অন্যদিকে আইনগত করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও বিভিন্ন কর ও প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে কার্যকর করের বোঝা অনেক ক্ষেত্রে ৪৩ থেকে ৪৮ শতাংশে পৌঁছে যায়।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ বছরে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভারতে এসেছে ৩৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, ভিয়েতনামে ২০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার, কম্বোডিয়ায় ৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানে ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের নিট এফডিআইয়ের মধ্যে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত সবচেয়ে বেশি, মোট ২৪ শতাংশ বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। এরপর খাদ্যশিল্পে ২২ শতাংশ, ব্যাংকিং খাতে ১৯ শতাংশ এবং জ্বালানি খাতে ১৭ শতাংশ বিনিয়োগ এসেছে।
এফআইসিসিআই মনে করে, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে। এজন্য স্বল্পমেয়াদে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি তৈরি এবং আধুনিক করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির মতে, ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি শক্তিশালী গন্তব্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

