দেশের শিল্প খাত এখন এক কঠিন সময় পার করছে। গত দুই বছরে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং রপ্তানি বাজারে অনিশ্চয়তা। ফলে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগে রপ্তানি আয়েও বছরের বড় একটি সময়জুড়ে ছিল নেতিবাচক প্রবণতা। সব মিলিয়ে দেশের উৎপাদনমুখী খাতগুলোতে চাপ আরও বাড়ছে।
এর মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অতিরিক্ত শুল্ক। জোরপূর্বক শ্রমে (ফোর্সড লেবার) তৈরি পণ্য আমদানি বন্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৪ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই শুল্ক প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় কম হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের শিল্প খাত বর্তমানে একাধিক সমস্যার মুখোমুখি। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ঋণের উচ্চ সুদ শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে নতুন কোনো বাড়তি ব্যয় যুক্ত হলে শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তাদের মতে, শিল্প খাতে গতি ফেরাতে সরকারকে নগদ সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি কর ও শুল্ক সুবিধা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে তুলনামূলক কম শুল্ক আরোপ করেছে, যা ইতিবাচক। তবে বিদ্যমান সংকটের মধ্যে এই শুল্কও শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, শিল্প খাতের স্থিতিশীলতার জন্য জ্বালানি সমস্যার সমাধান জরুরি। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করতে নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সহজ করা এবং ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
তাসকীন আহমেদের মতে, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি কারখানা বন্ধ এবং লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানের সরকারি উদ্যোগকে তিনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পণ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ। শুল্ক ব্যবধানের কারণে বাংলাদেশের কিছুটা সুবিধা থাকলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর শিল্প সক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হওয়ায় নতুন শুল্ক চাপ তৈরি করবে।
তার মতে, বাংলাদেশের শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়াতে এখন সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। দেশটিতে প্রতিবছর তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য নীতি রপ্তানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র এই খাতের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি। নতুন শুল্কের কারণে মার্কিন আমদানিকারকদের পণ্য আমদানির খরচ বাড়বে। যদিও শুল্ক পরিশোধ করেন আমদানিকারকরাই, তবে বাড়তি ব্যয়ের চাপ অনেক সময় সরবরাহকারীদের ওপর পড়ে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে হতে পারে। এতে মুনাফা কমার পাশাপাশি নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। এতে ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। তার মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে। তাই স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের আরও সতর্ক হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে।
বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ২৭ শতাংশে। তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশে নেমে আসে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য দেখাচ্ছে, অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প খাতে গতি ফিরিয়ে আনা জরুরি। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে শিল্প খাতের অন্যতম বড় সমস্যা এখন উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। এই ব্যয় কমাতে হলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিকল্প নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে জ্বালানি, বিনিয়োগ, ঋণ সুবিধা এবং রপ্তানি সক্ষমতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিল্প আরও চাপে পড়তে পারে।

