দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার বাজার হলেও সেই সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কয়েক বছর ধরে প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। ঘুরেফিরে তা থাকছে দুই বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চলের সাত দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে কাছের বাজার হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করেছে রপ্তানি।
২০২২-২৩ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চলে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে রপ্তানি আয় হয় ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। তবে পরের বছর আবার সামান্য কমে যায় অর্থাৎ পাঁচ বছরে সার্ক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়েনি, বরং ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার কমেছে।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ভারত। তবে বড় বাজার হলেও দেশটিতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার।
সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৮ শতাংশই আসে ভারতের বাজার থেকে। ফলে ভারতের বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও সার্ক অঞ্চলের মোট রপ্তানি আয়ে তার বড় প্রভাব পড়ে। বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক হলেও ভারতের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। দেশটিতে পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। ভারতের বাজারে তৈরি পোশাক থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ৫৭১ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিট পোশাক থেকে এসেছে ২৪৪ মিলিয়ন ডলার এবং ওভেন পোশাক থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৩৫ মিলিয়ন ডলার। পাদুকা থেকে ৯৬ মিলিয়ন ডলার, ভোজ্যফল ও বাদাম থেকে ১২৫ মিলিয়ন ডলার, চামড়াজাত পণ্য থেকে ৬২ মিলিয়ন ডলার, কাঁচা চামড়া থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার, উদ্ভিজ্জ টেক্সটাইল ফাইবার থেকে ১৮৩ মিলিয়ন ডলার, লোহা ও ইস্পাত পণ্য থেকে ৪৩ মিলিয়ন ডলার, মাছ থেকে ৭২ মিলিয়ন ডলার, উদ্ভিজ্জ চর্বি থেকে ১৭ মিলিয়ন ডলার এবং স্টার্চজাত পণ্য থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।
পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানেও কমেছে রপ্তানি:
সার্কের অন্য দেশগুলোর বেশির ভাগ বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমে হয়েছে ৭৬ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৮২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার।
পাকিস্তানের বাজারেও রপ্তানি কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭৩ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন ডলার থেকে তা নেমে এসেছে ৬৮ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারে। ভুটানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে আরও বেশি। দেশটিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১১ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার।
তবে ছোট কয়েকটি বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩৫ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে উঠেছে। মালদ্বীপে রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ৭ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে। আফগানিস্তানেও রপ্তানি ১১ দশমিক ০৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার।
রপ্তানিকারকদের মতে, সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক দূরত্ব কম হলেও বাণিজ্য সম্প্রসারণে রয়েছে নানা বাধা। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জটিলতা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক হলেও সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাজারে এই পণ্যের চাহিদা তুলনামূলক সীমিত। ফলে খাদ্যপণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়া, হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ নতুন খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, সার্ক অঞ্চলে তৈরি পোশাকের বাইরে বিভিন্ন পণ্যের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সীমান্ত জটিলতা এবং বাণিজ্যিক বাধার কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারতের বাজারে বড় সমস্যা হচ্ছে অশুল্ক বাধা। সীমিত স্থলবন্দর ব্যবহার, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং পণ্যের পরীক্ষার কারণে অনেক সময় রপ্তানি কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়। এতে ব্যবসার খরচও বেড়ে যায়। তার মতে, খাদ্যপণ্য, প্লাস্টিক ও ভোগ্যপণ্যের মতো খাতে সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভালো সুযোগ রয়েছে। এজন্য সীমান্ত ও বন্দর ব্যবস্থাপনা সহজ করা এবং বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমানো জরুরি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি কয়েক বছর ধরে দুই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে আটকে থাকার অন্যতম কারণ হলো একই ধরনের পণ্য উৎপাদনে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা। তার মতে, শুধু প্রচলিত পণ্যের ওপর নির্ভর করে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। নতুন পণ্য তৈরি, মান উন্নয়ন এবং মূল্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ভারতসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের উৎপাদনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে। তাই বাংলাদেশের এমন পণ্য বেছে নিতে হবে যেখানে আলাদা সুবিধা তৈরি করা সম্ভব। ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, চীন ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ কম দামে বৈচিত্র্যময় পণ্য সরবরাহ করায় প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হচ্ছে। এ অবস্থায় পণ্যের বহুমুখীকরণ, উদ্ভাবন এবং বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল গ্রহণ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার রপ্তানি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দেশের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন ও বিপণন কৌশল নিতে হবে। তৃতীয়ত, সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করা, দ্রুত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
ভৌগোলিক নৈকট্য বাংলাদেশের জন্য বড় সুবিধা হলেও শুধু এই সুবিধার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতামূলক পণ্য, সহজ বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই সার্ক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
