দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ আরও সহজ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। বিকাশের মার্চেন্টদের জন্য চালু হওয়া নতুন ডিজিটাল ন্যানো ঋণসেবার মাধ্যমে যোগ্য ব্যবসায়ীরা মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই এর প্রতি ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য সাড়া মিলেছে।
গত সপ্তাহে সীমিত পরিসরে এই সেবা চালু করা হয়। প্রথম চার দিনের মধ্যেই প্রায় ৪০০টি ঋণের আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রায় ২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা নতুন এই ব্যবস্থার প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে অর্থায়নের সুযোগ: বেসরকারি খাতের জন্য আরও সহায়ক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল মোমেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই আয়োজন করে।
তিনি জানান, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করায় আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই, অনুমোদন এবং ঋণের অর্থ ছাড়—পুরো প্রক্রিয়াই মাত্র এক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকে ঘুরতে বা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।
প্রাথমিকভাবে বিকাশের ৬০ হাজার মার্চেন্টকে এই সেবার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হলে পর্যায়ক্রমে বিকাশের সব মার্চেন্টের জন্য এই ঋণসেবা চালু করা হবে বলে জানান তিনি।
সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, এর আগে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের সহযোগিতায় ন্যানো ঋণসেবা চালু করা হয়েছিল। এবার প্রথমবারের মতো মার্চেন্টদের জন্য এই সুবিধা চালু হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসার প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সংগ্রহ করতে পারবেন। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণ আরও সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রয়োজনীয় তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা। ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের তথ্য যথাযথ নিরাপত্তা ও নীতিমালার আওতায় আরও সহজে ব্যবহার করা গেলে নতুন আর্থিক সেবা উদ্ভাবন এবং ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত নেওয়া সম্ভব হবে।
তার মতে, তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক আরও নতুন আর্থিক সেবা চালু করা সহজ হবে। এতে একদিকে যেমন ঋণ বিতরণের গতি বাড়বে, অন্যদিকে ঝুঁকি মূল্যায়নও আরও কার্যকর হবে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের সহায়তায় আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।
এ সময় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, এইচএসবিসি ব্যাংকের বহুজাতিক পাইকারি ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান আন্দালিব মির্জাসহ ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দ্রুত কার্যকরী মূলধন সংগ্রহ করতে না পারা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ পেতে অনেক সময় দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর এই ধরনের তাৎক্ষণিক ঋণসেবা সেই বাধা অনেকটাই দূর করতে পারে। তবে একই সঙ্গে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যের নিরাপত্তা এবং গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ হবে এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার পরিধিও আরও বিস্তৃত হবে।

