বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে। গত কয়েক দশকে তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় এবং কৃষির ওপর ভিত্তি করে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে অর্থনীতির পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে হলে শুধু প্রচলিত খাতের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। নতুন শিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর খাত এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এখন প্রয়োজন বড় পরিসরের বিনিয়োগ।
বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারীদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন। সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রচলিত প্রবৃদ্ধির কাঠামো মূলত তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয় ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, সীমিত রপ্তানি বৈচিত্র্য, দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার মতো বিষয়গুলো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরবর্তী পর্যায়ে বিদেশি বিনিয়োগকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগ শুধু অর্থের প্রবাহ বাড়ায় না, এর সঙ্গে আসে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ।
বাংলাদেশের রয়েছে বড় ভোক্তা বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এসব সুবিধা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগের জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে নীতির অনিশ্চয়তা, অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, জটিল করব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।
বিদেশি বিনিয়োগের বর্তমান চিত্রও বাংলাদেশের অবস্থানকে স্পষ্ট করে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৫ সালে মাত্র ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ পেয়েছে। নতুন বিদেশি মূলধনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের হার বর্তমানে মাত্র ০.২৯ শতাংশ। অথচ ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এই হার ৪.২৩ শতাংশ। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ২০১৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে তা স্থায়ীভাবে বাড়েনি। বরং দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রায় ১.২ বিলিয়ন থেকে ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি দেশে আসবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য তৈরি হবে এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে উন্নতমানের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নেও গতি আসবে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য গবেষণায় ১১ দফা সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় বিনিয়োগ সমন্বয় পরিষদ গঠন, বিনিয়োগ সংস্কারের জন্য বিশেষ সরকারি দল তৈরি, জাতীয় বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন, সমন্বিত বিনিয়োগ আইন চালু, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ভাবমূর্তি শক্তিশালী করা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। সাম্প্রতিক সময়ে যে বিনিয়োগ এসেছে, তার বড় অংশ নতুন বিনিয়োগ নয়; বরং বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃবিনিয়োগ।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিদেশি বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিয়েছে। ভিয়েতনাম রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে, মালয়েশিয়া প্রযুক্তি শিল্পের মাধ্যমে এবং থাইল্যান্ড গাড়ি শিল্পের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতাও গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কমে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগ, একটি নির্দিষ্ট রপ্তানি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং কর্মসংস্থান তৈরির ধীরগতি। বর্তমানে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের ২১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে যুব বেকারত্বের হার ৯.৪ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক জটিলতা সূচকে বাংলাদেশ ১৩২টি দেশের মধ্যে ১২৮তম অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশকে নতুন খাতগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। উন্নত উৎপাদন শিল্প, ইলেকট্রনিক পণ্য, ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করাই সবচেয়ে বড় বিষয়। বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে অর্থ বিনিয়োগের আগে ব্যবসা শুরু করার সহজতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার গতি, অবকাঠামো সুবিধা, আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা, মুনাফা দেশে ফেরানোর সুযোগ এবং নীতির ধারাবাহিকতা বিবেচনা করেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থিতিশীল নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, উন্নত অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বড় বিনিয়োগে রূপান্তর করতে পারবে।
সরকারও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সময় কমাতে সংস্কার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রক্রিয়া আবেদন করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে আগে প্রায় এক বছর সময় লাগত।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতির নিশ্চয়তা। সরকার এসব ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ রয়েছে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, বড় বাজার এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন।
বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়, কিন্তু সঠিক সংস্কার, স্বচ্ছ নীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে এটি সম্ভব হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ শুধু অর্থনীতিতে অর্থ যোগ করবে না, বরং শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন পথও তৈরি করবে।

