বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করে যখন দেশের ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণ ও আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে, তখন ক্ষুদ্রঋণ খাতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। নিয়মিত ঋণ আদায়, উচ্চ সুদ আয় এবং ধারাবাহিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের শীর্ষস্থানীয় এনজিওগুলো এখন বড় অঙ্কের তহবিলের মালিক হয়েছে।
একসময় বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকা এসব প্রতিষ্ঠান এখন ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থেকেই নিজেদের আর্থিক ভিত্তি শক্ত করেছে। বছরের পর বছর জমতে থাকা উদ্বৃত্ত অর্থের মাধ্যমে অনেক এনজিওর তহবিলে জমা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর যে অতিরিক্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকে এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে জমা হতে হতে বড় তহবিলে পরিণত হয়, তাকে বলা হয় ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত। ক্ষুদ্রঋণ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থেকে অর্জিত মোট উদ্বৃত্তের একটি অংশ বিধি অনুযায়ী সংরক্ষণ করার পর অবশিষ্ট অর্থই ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এমআরএর নীতিমালা অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের উদ্বৃত্তের ১০ শতাংশ সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে রাখতে হয়। এই অর্থ বাদ দেওয়ার পর যে উদ্বৃত্ত জমা থাকে, সেটিই ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত হিসেবে হিসাব করা হয়। এমআরএর তথ্য ও এনজিওগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্বৃত্ত তহবিলের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংস্থাটির ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪১১ কোটি টাকা।
এর পরের অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক। সংস্থাটির উদ্বৃত্ত তহবিলের পরিমাণ ১৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যুরো বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। এ ছাড়া টিএমএসএসের উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে ২ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা, সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসের (এসএসএস) ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের ১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা এবং পল্লী মঙ্গল কর্মসূচির (পিএমকে) ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা।
এছাড়াও সাজেদা ফাউন্ডেশন, সিদীপ, প্রত্যাশী, পদক্ষেপ ও ক্রিশ্চিয়ান সার্ভিস সোসাইটির মতো কয়েকটি এনজিওর প্রত্যেকের উদ্বৃত্ত তহবিল ৪০০ কোটি টাকার বেশি। শুধু উদ্বৃত্ত তহবিল নয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও বড় অবস্থানে রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। গ্রাহকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে ব্র্যাক। সংস্থাটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৪৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি।
ঋণ বিতরণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আশা। প্রতিষ্ঠানটি বিতরণ করেছে ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যুরো বাংলাদেশের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকিং খাত যেখানে বড় ঋণের ঝুঁকি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আর্থিক সক্ষমতা দেশের আর্থিক খাতের একটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরছে।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় এনজিওগুলো আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলেও এই ঋণ দরিদ্র মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অবস্থার কতটা পরিবর্তন করতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমামের মতে, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ কিছুটা উপকৃত হলেও তাদের আর্থিক অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে না। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের অর্থ দিয়ে অনেকেই সন্তানের শিক্ষা ব্যয়, পরিবারের চিকিৎসা খরচ কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। তবে এই ঋণ তাদের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন ঘটাতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে এক ঋণ পরিশোধ করতে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে তারা ঋণের চক্রে আটকে পড়ছেন। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখলেও এর পরিমাণ খুবই সীমিত। সামগ্রিকভাবে এই ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষকে আরও দরিদ্র হওয়া থেকে রক্ষা করছে, কিন্তু তাদের দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে পারছে না।
এদিকে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) জমে থাকা উদ্বৃত্ত তহবিলের বড় অংশ আবার ঋণ বিতরণে ব্যবহার করা হয়। এ অর্থ ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো সুদ খরচ বহন করতে হয় না। ফলে উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে দেওয়া ঋণে তাদের মুনাফার সুযোগও বেশি থাকে।
বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিয়ে ঋণ বিতরণ করতে পারে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) কিংবা গ্রাহকের সঞ্চয় থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ঋণ বিতরণ করলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণত ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ব্যয় করতে হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঋণ আদায়ের সক্ষমতা। জামানত ছাড়াই দেওয়া এসব ঋণের আদায়ের হার ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মিত ঋণ ফেরত পাওয়ার এই সাফল্যই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্ত করার অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারহোল্ডার বা মালিকানাভিত্তিক না হওয়ায় তাদের কোনো লভ্যাংশ পরিশোধ করতে হয় না। ফলে অর্জিত উদ্বৃত্তের বড় অংশ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব তহবিলে জমা থাকে। অন্যদিকে কর সুবিধার ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থেকে পাওয়া সেবা, সুদ বা মুনাফার অংশ করমুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত অর্থের ওপর এনজিওগুলোকে করপোরেট কর দিতে হয় না।
তবে ক্ষুদ্রঋণের বাইরে থাকা আয়ের অংশের ওপর কর প্রযোজ্য। এই সুবিধার কারণে এনজিওগুলো বড় ধরনের কর ছাড় পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যেখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলক বেশি হারে করপোরেট কর পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশ।
এমএফআইগুলোর কর সুবিধা ও বিপুল উদ্বৃত্ত তহবিল নিয়ে কর বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসির পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোর পক্ষে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোট অঙ্কের ঋণ দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, পাঁচ হাজার টাকার মতো ছোট ঋণ দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি হয়। এ কারণেই তাদের করপোরেট করের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত জমা হয়, তখন সরকার চাইলে কর সুবিধার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।
আয়কর আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে শতভাগ জামানত নিয়েও ঋণ আদায় করতে পারছে না। অথচ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই প্রায় পুরো ঋণ আদায় করতে সক্ষম হচ্ছে।
তার মতে, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কর সুবিধা ও ঋণ আদায়ের সফলতার কারণে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। এতে তারা আরও বেশি মানুষের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, এনজিওগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল যদি আরও বড় আকার ধারণ করে, তাহলে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ তৈরি হবে এবং সরকারও রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ব্যুরো বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায়ে নিয়মিত নজরদারি রাখে বলেই এ খাতে খেলাপির হার কম। এটাই এই খাতের বড় সাফল্য।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, করোনার সময় ঋণ আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া, বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষুদ্রঋণ খাতেও খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে চলতি বছরে আগের বছরের তুলনায় উদ্বৃত্তের পরিমাণ কমতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপকতা তুলে ধরে জাকির হোসেন বলেন, প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় আড়াই কোটি গ্রাহক। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই ঋণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর বড় অংশ কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আয়মূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক প্রয়োজন ও ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণেও বিভিন্ন ধরনের ঋণ প্রকল্প চালু রয়েছে। তবে শুধু ঋণ গ্রহণ করলেই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।
এদিকে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিশেষ করে বিগত সরকারের সময় ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়মের কারণে সংকট আরও গভীর হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেনামি ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি কিংবা ব্যবসায়িক সমস্যায় পড়া ঋণ—দুই ক্ষেত্রেই অর্থ উদ্ধারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ফলে খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ছে। গত মার্চের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বিপুল খেলাপির কারণে ২৪টি ব্যাংক প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
উচ্চ খেলাপির কারণে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে একীভূত করা হয়েছে। এক্সিম, গ্লোবাল, ইউনিয়ন, সোশ্যাল ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। নতুন এই ব্যাংকের মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার ইক্যুয়িটি হিসেবে দিচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণ খাতে ঋণ আদায়ের হার তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণে ঋণ আদায়ের পদ্ধতিও আলাদা। এনজিও কর্মীরা নিয়মিত গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তি সংগ্রহ করেন।
এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণের অধিকাংশ গ্রাহক নিম্ন আয়ের মানুষ হওয়ায় ঋণ পরিশোধের বিষয়ে তাদের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা বেশি কাজ করে। ধর্মীয় বিশ্বাসসহ নানা সামাজিক কারণে অনেক গ্রাহক সময়মতো ঋণ পরিশোধে আগ্রহী থাকেন। এসব কারণেই ক্ষুদ্রঋণ খাতে খেলাপির হার তুলনামূলক কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন বলেন, এনজিওগুলোর ঋণ আদায়ের হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। গ্রাহক নির্বাচন থেকে শুরু করে ঋণ বিতরণ ও আদায় পর্যন্ত কঠোর নজরদারির কারণে এ খাতে খেলাপি ঋণের হার খুবই কম।
তিনি বলেন, ব্যাংকের তুলনায় ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার বেশি হলেও গ্রাহকরা কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অনেকাংশে এনজিওগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনজিওগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এনজিওগুলোর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে তাদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য তুলনামূলক সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ থাকলেও এনজিওগুলোর মাধ্যমে দেওয়া ঋণে খেলাপির হার খুবই কম।
এমআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট তহবিলের বড় অংশ এসেছে নিজস্ব উৎস থেকে। এ সময়ে এনজিওগুলোর হাতে সদস্যদের সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট তহবিলের প্রায় ৪০ শতাংশ।
একই সময়ে এনজিওগুলোর ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এটি তাদের মোট তহবিলের প্রায় ৩৪ শতাংশ। এছাড়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। আর পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয় দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে। ১৯৭৪ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে ব্যক্তিগত অর্থায়নে দরিদ্র গ্রামীণ নারীদের ছোট অঙ্কের ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে এই উদ্যোগ শুরু করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে এটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বা অ্যাকশন রিসার্চ হিসেবে পরিচালিত হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রামীণ ব্যাংক। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) যুক্ত হওয়ার পর দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০০টি এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক চাহিদা পূরণে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

