মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে টার্মিনাল দুটির সরবরাহ সক্ষমতার তুলনায় নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। এতে চট্টগ্রামের সিএনজি স্টেশন, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকেরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
১২ আগস্ট সকাল ১০টা পর্যন্ত পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ সক্ষমতার মাত্র ৩৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ।
মহেশখালীতে বাংলাদেশের আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে এক্সিলারেট এনার্জি, যার দৈনিক পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যটি সামিট এলএনজির, যার সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান জানান, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারের একটি বর্তমানে সচল রয়েছে। অন্যটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। কাজ শেষ হলে সেটিও আবার চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সামিটের টার্মিনালেও তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের সমস্যা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে নিরাপদে ভিড়তে পারছে না। প্রবল বাতাসসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জাহাজ থেকে এলএনজি খালাসের কাজও শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা জানান, কারিগরি দল প্রস্তুত রয়েছে। তবে আবহাওয়া ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত জাহাজ থেকে এলএনজি খালাসের কাজ শুরু করা যাবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট
মহেশখালীর সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ ১২ আগস্ট সকালে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
ফলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৪০ শতাংশ।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রকৌশল সেবা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দীন ধালী জানান, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলো যাতে পুরোপুরি সরবরাহবঞ্চিত না হয়, সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ১১ আগস্ট সকালে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ ২৩০ থেকে ২৩৪ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে ছিল। তবে দুপুরের পর আবার সরবরাহ কমতে শুরু করে। রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং ১২ আগস্ট সকালে ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে। বিভিন্ন স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কোথাও আবার সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে চালকদের।
মুরাদপুরের ফসিল পেট্রোল পাম্পে ১২ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে গ্যাস নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন চালক আখতার হোসেন। তিনি জানান, সকাল ৮টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক দিন স্বাভাবিক থাকার পর আবারও একই সংকট শুরু হয়েছে।
স্টেশনটির ব্যবস্থাপক মো. ফখরুদ্দিন ইসলাম শিমুল জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক গতিতে গাড়িতে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত স্টেশনে গ্যাসের চাপের মাত্রা ২২০ থাকলেও এখন তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস ভরতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে।
তিনি জানান, সোমবার রাত থেকেই সমস্যা শুরু হয়। কিছু সময় গ্যাস এলেও অল্প পরপর আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তবে এ বিষয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি।
চট্টগ্রাম ওয়াসা মোড়ের কাছে এসএইচ খান অ্যান্ড সন্স সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সেখানে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও গ্যাসের আশায় গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন অনেকে।
অটোরিকশাচালক মো. শফিক জানান, তিনি সকাল ৬টা থেকে অপেক্ষা করছেন। কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্যও নেই। প্রতিদিন গাড়ির ভাড়া বাবদ ১ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়। ফলে আয় না হলেও খরচ ঠিকই বহন করতে হচ্ছে।
নগরীর টাইগারপাস এলাকার রেইনবো সিএনজি স্টেশনেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট এবং চালকদের আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানাতেও প্রভাব
গ্যাস সংকট শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। আবাসিক গ্রাহকেরাও রান্নাবান্না নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
হামজারবাগের বাসিন্দা মো. আফজাল ফোরকান জানান, বিদ্যুতের সমস্যার সঙ্গে এখন গ্যাসের সংকটও যুক্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় রান্না করতেও সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চান তিনি।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটছে। স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, করোনাকালীন সময়ের মতো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে একটি নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত।
এই প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের মোট চাহিদা, প্রকৃত উৎপাদন ও সরবরাহ, ঘাটতির পরিমাণ, এলএনজির অবদান এবং বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও আবাসিক খাতে সরবরাহের পরিমাণ জানানো যেতে পারে।
এ ছাড়া কোন এলাকায় কত ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, গ্যাসের চাপ কত এবং সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় কী ধরনের প্রভাব পড়ছে—এসব তথ্যও প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় গ্যাস পরিস্থিতি সামাল দিতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, এলএনজি আমদানির অগ্রগতি এবং দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। এতে গুজব ও বিভ্রান্তি কমার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিও বাড়বে।
এক্সিলারেটের টার্মিনাল এখনো পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি
এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে ২১ জুলাই একটি দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। পরে ৬ আগস্ট একটি বয়লার চালু করা সম্ভব হলে আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু হয়। তবে দ্বিতীয় বয়লারটি এখনো মেরামতের অধীনে রয়েছে।
এর পাশাপাশি সামিটের টার্মিনালে থাকা এলএনজিবাহী জাহাজ বৈরী আবহাওয়ার কারণে নিরাপদে ভিড়তে না পারায় নতুন করে আমদানি করা এলএনজি খালাসও বিলম্বিত হচ্ছে।
ফলে মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। আর এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে চট্টগ্রামের শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নগরীর গ্যাস সরবরাহে এই চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

