বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও সোনার দাম বেড়েছে। একই সময়ে এশিয়ার শেয়ারবাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা ছিল স্পষ্ট। এর বড় কারণ, দিনের পরবর্তী সময়ে প্রকাশ হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের পক্ষ থেকে জাহাজে পৃথক হামলার খবর এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বৈশ্বিক বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের কঠোর অবস্থান এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ আর্থিক বাজার বিশ্লেষক কাইল রোডা বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি অব্যাহত থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে বাজারের মনোভাব অনেকটাই সতর্ক রয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের অবস্থানে অনড় থাকায় তেলের দামের ঝুঁকি এখনো বাড়তির দিকেই রয়েছে।
বাড়ল অপরিশোধিত তেল ও সোনার দাম
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ দশমিক ৯৪ ডলারে উঠেছে। ব্রেন্ট তেলের দাম বেড়েছে ০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৬০ ডলার।
এর আগে মঙ্গলবার উভয় ধরনের তেলের দামই ১ ডলারের বেশি বেড়েছিল। ফলে গত ৩১ জুলাইয়ের পর মঙ্গলবারই তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সোমবারও তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ লাফ দিয়েছিল।
এদিকে স্পট মার্কেটে সোনার দাম ০ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৮৭ দশমিক ০৩ ডলারে উঠেছে।
জাহাজে হামলায় নতুন উদ্বেগ
মঙ্গলবার ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হুতিদের হামলায় মিসরীয় মালিকানাধীন একটি জাহাজের চারজন নাবিক নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের একটি বন্দরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা একটি কনটেইনার জাহাজে তারা হামলা চালিয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুতিদের হামলায় এই চারজনের মৃত্যু হলে এটিই হবে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উত্তেজনা কমার পরিবর্তে বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দ্রুত যুদ্ধবিরতি বা চুক্তির সম্ভাবনার কথা বললেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হওয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ
এশিয়ার বাজারেও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ কমেনি। বুধবার ভোরে উত্তর কোরিয়া কোরীয় উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়ার কয়েক দিন আগে এই উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটল। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের সামরিক মহড়ার বিরোধিতা করে আসছে।
এর পাশাপাশি তাইওয়ান তাদের পূর্ব উপকূলের কাছে চীন ও ইন্দোনেশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজের পরিকল্পিত নৌ মহড়া নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।
বাজারের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যে
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যসূচকের বা সিপিআইয়ের দিকে। এই তথ্য থেকেই আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াবে কি না, সে বিষয়ে বাজারে নতুন ধারণা তৈরি হতে পারে।
তবে বুধবারের সিপিআই প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দামের যে বৃদ্ধি হয়েছে, তার পুরো প্রভাব ধরা পড়বে না।
রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, জুনে ০ দশমিক ৪ শতাংশ কমার পর জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্য ০ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের বাজার গবেষণা বিভাগের প্রধান স্কাই মাস্টার্স বলেন, সবার নজর এখন সিপিআই প্রতিবেদনের দিকে। মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে বন্ডবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ বাড়ানোর প্রত্যাশা কিছুটা কমতে পারে।
জাপানের সুদের হার নিয়েও জল্পনা
এদিকে জাপানেও দ্রুত সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আলোচনা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশটির স্বল্পমেয়াদি সরকারি বন্ডে।
জাপানের পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ ২ দশমিক ১ শতাংশে উঠে নতুন রেকর্ড করেছে। দুই বছর মেয়াদি বন্ডের সুদও ১ দশমিক ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মুদ্রাবাজারে ডলার সূচক ০ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ৮৫ হয়েছে। ইউরোর দাম ০ দশমিক ০২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৫৩৮ ডলারে।
জাপানি ইয়েন ডলারের বিপরীতে ০ দশমিক ০৩ শতাংশ দুর্বল হয়ে প্রতি ডলারে ১৫৯ দশমিক ৩১ ইয়েনে নেমেছে। গত সপ্তাহে ইয়েনের দাম ১৫৫ দশমিক ২০ পর্যন্ত উঠেছিল। এরপর বাজারে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
ব্রিটিশ পাউন্ডও ০ দশমিক ০১ শতাংশ দুর্বল হয়ে ১ দশমিক ৩৫০১ ডলারে নেমেছে।
ইউরোপের শেয়ারবাজারে চাপ
ইউরোপের বাজার খোলার আগের লেনদেনে বড় সূচকগুলোর ফিউচার কিছুটা নিম্নমুখী ছিল।
প্যান-ইউরোপীয় ইউরো স্টক্স ৫০-এর ফিউচার ০ দশমিক ১৫ শতাংশ কমে ৬ হাজার ৫৬৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জার্মান ড্যাক্সের ফিউচার ০ দশমিক ১২ শতাংশ কমে ২৬ হাজার ৪৪৪ পয়েন্ট এবং এফটিএসই ফিউচার ০ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ১০ হাজার ৮২৫ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ফিউচার ০ দশমিক ০৩ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৭৫০ পয়েন্টে ছিল।
সব মিলিয়ে তেল ও সোনার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার এখন একাধিক ঝুঁকির দিকে তাকিয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, এশিয়ার সামরিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য—এই চারটি বিষয়ই আগামী দিনগুলোতে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

