দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা যেন কাটছেই না। একের পর এক প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কাঁচামরিচের দাম। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে এখন প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা দরে। একই সঙ্গে পেঁয়াজ, ডিম, মাছ এবং বেশিরভাগ সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বাজার করতে গিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন ক্রেতারা।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানীর নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজার ও হাতিরপুল ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকছে না।
এক সপ্তাহেই কাঁচামরিচে বড় লাফ
বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা। ছোট পরিমাণে কিনতে চাইলে ১০০ গ্রাম ৪০ টাকা এবং ২৫০ গ্রাম ১০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। তবে আধা কেজি বা এক কেজি কিনলে কিছুটা কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।
বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও কাঁচামরিচের কেজি ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। তারও আগে দাম ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতি কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
এ ধরনের হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি শুধু ক্রেতাদের জন্য নয়, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বেশি দামে পণ্য কিনে বিক্রি করলেও ক্রেতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
পেঁয়াজেও বাড়তি চাপ
কাঁচামরিচের পাশাপাশি পেঁয়াজের বাজারেও বেড়েছে দাম। কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশি পেঁয়াজের কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা ছিল। বর্তমানে একই পণ্য বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা দরে। মাত্র চার দিন আগেও যার দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়েছে। বিশেষ করে ভালো মানের পাবনার পেঁয়াজের দাম এখন ৬৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
অধিকাংশ সবজিই ১০০ টাকার ওপরে
কয়েকটি সবজির দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিকভাবে বাজার এখনও বেশ চড়া।
বর্তমানে লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, গোল কালো বেগুন ১৮০ টাকা এবং সাদা বেগুন ১৪০ টাকা কেজি দরে। ধুন্দুল ও পটলের দাম কিছুটা কমে ৬০ থেকে ৮০ টাকা হলেও করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ১১০ থেকে ১৩০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মৌসুমি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া এবং পরিবহন ব্যয়সহ বিভিন্ন কারণে সবজির দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
ডিমের দামও বাড়ল
প্রোটিনের তুলনামূলক সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের দামও বেড়েছে।
বর্তমানে ফার্মের ডিমের প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা দরে। গত সপ্তাহে একই ডজনের দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। আর এক মাস আগে এই ডিম পাওয়া যেত ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দামে।
অন্যদিকে মুরগির বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী দাম
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। গত সপ্তাহের তুলনায় বেশিরভাগ মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, টেংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা এবং পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় আমিষজাত খাদ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে।
কেন বাড়ছে বাজারের চাপ?
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহের ঘাটতি, মৌসুমি উৎপাদনের ওঠানামা এবং পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব খুচরা বাজারে এসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত বাড়তি চাপ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিশেষ করে কাঁচামরিচের মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ সামান্য কমে গেলেও বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। একই প্রবণতা পেঁয়াজ, মাছ ও অন্যান্য সবজির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে।
সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য মাসিক বাজারের বাজেট ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। যে পণ্যগুলো প্রতিদিনের রান্নার অপরিহার্য অংশ, সেগুলোর প্রায় সবকটির দামই বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ দ্রুত শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় নিত্যপণ্যের মূল্যচাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

