দেশের তৈরি পোশাক খাতে স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে মূল্য সংযোজনের শর্ত আরও কঠোর করেছে সরকার। নতুন আমদানি নীতিতে পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের ন্যূনতম হার সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার ঠেকানো এবং দেশের পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যও রয়েছে এই নীতিতে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯-এ পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য পণ্যের মূল্য, ধরন এবং কাঁচামাল সংগ্রহের পদ্ধতি অনুযায়ী বিভিন্ন হারে মূল্য সংযোজনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সোমবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নতুন নীতিতে তুলনামূলক বেশি দামের পোশাক উৎপাদনকে উৎসাহিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সাধারণ ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের আওতায় প্রতি ডজন ৬০ মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যমানের বোনা ও নিট পোশাকের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের হার আগের মতো ১০ শতাংশ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতি ডজন ৬০ মার্কিন ডলারের কম মূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে এই হার ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে ৬০ ডলারের কম মূল্যমানের বোনা ও নিট পোশাকের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের শর্ত ছিল ২০ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলক কম দামের পোশাকের ক্ষেত্রে নতুন নীতিতে স্থানীয়ভাবে যুক্ত হওয়া মূল্য বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে নিয়মিত ঋণপত্রের আওতায় ন্যূনতম মূল্য সংযোজন ১৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। অন্তর্বাস ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ শতাংশ।
তবে বিনা মূল্যে সরবরাহ করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। এ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু—উভয় ধরনের বোনা ও নিট পোশাক তৈরি করলে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে হবে। কৃত্রিম তন্তু ও অন্তর্বাসের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।
শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রেও বিনা মূল্যে সরবরাহ করা কাঁচামালের ওপর মূল্য সংযোজনের শর্ত দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগের ১৫ শতাংশের পরিবর্তে এখন ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে হবে।
পোশাকের বাইরে আরও কয়েকটি শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রেও মূল্য সংযোজনের নির্দিষ্ট সীমা রাখা হয়েছে। সাধারণ ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের আওতায় জুতা, চামড়াজাত পণ্য, চামড়া ছাড়া তৈরি জুতা ও ব্যাগ, জাহাজ নির্মাণ, আসবাবপত্র এবং নির্দিষ্ট পুরুত্বের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের হার ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনা মূল্যে সরবরাহ করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে এসব পণ্যের বেশির ভাগের জন্য হার ৩০ শতাংশ। তবে আসবাবপত্রের ক্ষেত্রে তা ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য শুধু পোশাক রপ্তানি বাড়ানো নয়; বরং রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ যেন দেশের ভেতরেই উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমের মাধ্যমে তৈরি হয়, সেটিও নিশ্চিত করা। বর্তমানে পোশাকশিল্পের একটি বড় অংশ আমদানি করা কাপড়, সুতা, তন্তু ও অন্যান্য উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। মূল্য সংযোজনের শর্ত বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার স্থানীয় কাঁচামাল ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের ব্যবহার বাড়াতে চাইছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, বস্ত্র ও পোশাক খাতের তিনটি সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন—৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
তার মতে, মূল্য সংযোজনের হার বাড়লে দেশে উৎপাদিত কাঁচামালের ব্যবহার বাড়বে এবং পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে আরও শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন নীতির কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ মনে করেন, তুলাভিত্তিক পোশাকের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই সীমা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর পেছনে বাংলাদেশের কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদন ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি দেশে এই খাতের পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্প এখনও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী নয়। ফলে শুধু নিয়ম কঠোর করলেই কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকে দ্রুত মূল্য সংযোজন বাড়ানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বিনা মূল্যে সরবরাহ করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতার পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ এ ব্যবস্থায় বিদেশি ক্রেতারাই নিজেদের খরচে পোশাক তৈরির কাপড় সরবরাহ করেন। ফলে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের ওপর কাঁচামাল সংগ্রহের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।
তার মতে, এ ক্ষেত্রে ক্রয় বাতিল, মূল্যছাড় বা দ্রুত আকাশপথে পণ্য পাঠানোর মতো অতিরিক্ত ঝুঁকির সম্ভাবনাও কম থাকে। বিশেষ করে যারা কম দামের সাধারণ পোশাক বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করেন, তাদের জন্য ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সব সময় বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অবশ্য কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক ও অন্তর্বাসের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন নির্ধারণের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা না করেই সরকার এই হার নির্ধারণ করেছে।
তিনি সাধারণ ঋণপত্র এবং বিনা মূল্যে সরবরাহ করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের হারে পার্থক্য রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বিনা মূল্যে কাঁচামাল আনার ব্যবস্থা বরং তুলনামূলক নিরাপদ, কারণ এতে রপ্তানি আয় দেশে না আনার সুযোগ নেই।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বন্ধ বা আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়া এমন কারখানাও বিনা মূল্যে সরবরাহ করা কাঁচামাল এনে উৎপাদন করতে পারে, যাদের ঋণ ইতোমধ্যে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে। উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে। তাই একদিকে সরকার যখন বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর নীতি গ্রহণ করছে, অন্যদিকে বিনা মূল্যে কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করা সেই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মূল্য সংযোজনের নতুন নিয়মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক শিল্পকে ঘিরে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। বৈশ্বিক পোশাকের বাজারে কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই পরিবর্তনশীল বাজারের সুযোগ নিতে হলে দেশকে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কিন্তু এই খাতে উৎপাদন বাড়াতে হলে শুধু রপ্তানিকারকদের ওপর বেশি মূল্য সংযোজনের শর্ত আরোপ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, সুতা, তন্তু ও রাসায়নিক উপকরণের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করা, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
সরকারের নতুন নীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। যদি মূল্য সংযোজনের শর্তের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর নীতিও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পোশাক রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ দেশের অর্থনীতির ভেতরেই ঘুরতে পারে। এতে শুধু পোশাক কারখানা নয়, সুতা, কাপড়, তন্তু, আনুষঙ্গিক পণ্য ও অন্যান্য সহযোগী শিল্পেরও সম্প্রসারণ ঘটতে পারে।
তবে উল্টো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও স্থানীয় কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত না করে মূল্য সংযোজনের শর্ত বেশি কঠোর করা হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে কম দামের পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বাংলাদেশের পোশাক খাত যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে দামের প্রতিযোগিতার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তাই নতুন নীতির বাস্তব প্রয়োগে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, মূল্য সংযোজনের শর্ত বাড়ানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থানীয় ও স্বনির্ভর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পকে শক্তিশালী করা গেলে দেশের পোশাক খাত শুধু রপ্তানির পরিমাণে নয়, উৎপাদনের গভীরতার দিক থেকেও এগিয়ে যেতে পারে।
তবে সেই পরিবর্তনের জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর শুধু নতুন নিয়ম চাপিয়ে দিলেই হবে না। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী স্থানীয় কাঁচামাল শিল্প, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নীতির ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা যখন বাড়ছে, তখন এই খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও এখনই কাজে লাগাতে হবে।
নতুন নীতি তাই একদিকে পোশাকশিল্পের জন্য বাড়তি চাপ, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্প সম্প্রসারণের একটি বড় সুযোগ। এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সরকার ও শিল্প খাত কতটা সমন্বিতভাবে নতুন মূল্য সংযোজনের কাঠামো বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর।

