দেশের অর্থনীতির ভিত্তি যতটা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র, কুটির, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং উৎপাদন বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই খাতের অবদান দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখযোগ্য। অথচ সম্ভাবনাময় এই খাতই এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।
বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সুযোগও তৈরি হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিন কোটির বেশি মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। দেশে প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছে। এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ উদ্যোক্তা আজ নানা সংকটে জর্জরিত।
কয়েক বছর আগেও অনেক তরুণ নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেই উৎসাহ অনেকটাই কমেছে। ব্যবসা শুরু করার পর মূলধন ধরে রাখা, উৎপাদন অব্যাহত রাখা কিংবা বাজারে প্রতিযোগিতা করা—সব ক্ষেত্রেই ছোট উদ্যোক্তাদের লড়াই করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের নীতিগত ও কাঠামোগত দুর্বলতা একসঙ্গে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই ধরে রাখতে পারছেন না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, টাকার মান কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের বাজার দখলের প্রবণতা। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতিও অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলক সহজে ব্যাংকঋণ পেলেও ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে জামানত, কাগজপত্র এবং বিভিন্ন শর্ত অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে ঋণ বিতরণ নেমে এসেছে চার বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ওই অর্থবছরে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এখন অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
সরকারি নীতিমালায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা অনেকের কাছেই অধরা থেকে যাচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, একটি ব্যবসা চালু রাখতে বা নবায়ন করতে নানা ধরনের অনুমোদন, ছাড়পত্র ও লাইসেন্স সংগ্রহে সময় ও অর্থ—দুই-ই ব্যয় হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেবা পেতে অতিরিক্ত হয়রানিরও মুখোমুখি হতে হয়।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শুধু একটি বাণিজ্যিক লাইসেন্স নবায়ন করতেই ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। ফলে ব্যবসা শুরুর আগেই নতুন উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।
বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রাবাজারের অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ক্ষুদ্র শিল্পে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু দাম বাড়লে ক্রেতার সংখ্যা কমে যায়। ফলে বিক্রি ও মুনাফা—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ অবস্থায় অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার নতুন বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছেন। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে উৎপাদন ও বিপণনে প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র শিল্প এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতেই পরিচালিত হচ্ছে।
আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার অভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিপণনের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারায় অনেক উদ্যোক্তা বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগও হারাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ছাড়া এই খাতের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে না।

