বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায় দীর্ঘদিন ধরেই বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সরকার প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও একই চিত্র দেখা গেছে। এর ফলে টানা দশম অর্থবছরের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি শুধু রাজস্ব ঘাটতির বিষয় নয়; বরং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, উন্নয়ন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে আদায় কম হয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকারকে ব্যয় নির্বাহে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় ঘাটতির অন্যতম কারণ শুরু থেকেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি নির্ধারণ করা। তাদের মতে, কর প্রশাসনের দুর্বলতা, সীমিত করভিত্তি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতির মতো সমস্যাগুলো বিবেচনায় না এনে উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করলে শেষ পর্যন্ত তা অর্জন করা সম্ভব হয় না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমানের মতে, রাজস্ব কম আদায় হলেও সরকারের নিয়মিত ব্যয় থেমে থাকে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হয়। ফলে প্রত্যাশিত রাজস্ব না এলে সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঋণনির্ভরতা শুধু বর্তমান অর্থবছরের সমস্যা সৃষ্টি করে না; বরং ভবিষ্যতের বাজেটের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে। কারণ ঋণের মূল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হয়। ফলে প্রতি বছর বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায় এবং উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশকে ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী বছরগুলোতে ঋণের পরিমাণ বাড়লে এই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। তবে অনেক অর্থনীতিবিদই এই লক্ষ্যকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন। তাদের মতে, গত অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের নজির অতীতে নেই। ফলে লক্ষ্য পূরণ না হলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ মো. দ্বীন ইসলাম মনে করেন, দেশের ইতিহাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কখনোই এক অর্থবছরে ৩০ শতাংশের বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। তাই বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, লক্ষ্য অর্জিত না হলে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সবসময় একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকলে অর্থনীতির প্রতি আস্থা কমে যায় এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক কম। এর পেছনে শুধু করদাতার সংখ্যা সীমিত হওয়াই নয়, কর প্রশাসনের নানা দুর্বলতাও দায়ী। তাই শুধু উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিবর্তে কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, করদাতাবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান কর আইনের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মূল্য সংযোজন কর এখনো সরকারের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। এ সময় মূল্য সংযোজন কর আদায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা।
অন্যদিকে আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই খাত থেকে রাজস্ব আদায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট রাজস্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এছাড়া শুল্ক এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। যদিও তিনটি প্রধান খাতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবুও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির কারণে প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি। তবে চলতি অর্থবছরে করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নতুন কর আরোপ বা লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে রাজস্ব সমস্যা সমাধান করা যাবে না। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত বাজেট পরিকল্পনা, দক্ষ কর প্রশাসন, স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং করদাতাদের জন্য সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা। অন্যথায় প্রতিবছর একই ধরনের রাজস্ব ঘাটতি সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়াবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

