বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় যাকে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাতকে। এই খাতেই কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবার বড় এক পদক্ষেপ নিল ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক এই শাখা ব্র্যাক ব্যাংককে ৫০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫ কোটি ডলার) অর্থায়ন সুবিধা দিচ্ছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে এই ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। এটি একটি সিনিয়র আনসিকিউরড ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সলিউশন (ডব্লিউসিএস) সুবিধা, যার মেয়াদ এক বছর, তবে দুবার নবায়নের সুযোগ থাকায় সর্বোচ্চ তিন বছর ব্যবহার করা যাবে। এতে ব্যাংকটি মাঝারি মেয়াদে ডলারের জোগান পাবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিসহ বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গ্রাহকদের সহায়তা করবে।
আইএফসির এই অর্থায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর বণ্টন কাঠামো। তহবিলের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বা সমপরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা বরাদ্দ করা হবে নারী-নেতৃত্বাধীন এমএসএমই খাতে। আর ন্যূনতম ২৫ শতাংশ দেওয়া হবে কৃষি খাতের এমএসএমইতে। অর্থাৎ, এই তহবিলের সিংহভাগই যাচ্ছে সেই দুটি খাতে, যেখানে অর্থায়নের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি যেমন সুযোগ বাড়াবে, তেমনি কৃষি খাতের ছোট উদ্যোক্তারাও পাবেন আর্থিক সেবার দোরগোড়ায় পৌঁছানোর সুযোগ।
ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য এটি আইএফসি থেকে ধারাবাহিকভাবে পাওয়া চতুর্থ অর্থায়ন সুবিধা। আগের অর্থায়নগুলো ছিল কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বাণিজ্য অর্থায়ন ও কর্মসংস্থান সংরক্ষণে সহায়তার জন্য। প্রতিবারই ব্র্যাক ব্যাংক প্রমাণ করেছে, তারা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর জন্য একজন বিশ্বস্ত অংশীদার। আর এবারের অর্থায়নটি তার চেয়েও বেশি কৌশলগত কারণ এটি আইএফসির ‘এমএসএমই ফাইন্যান্স প্লাটফর্ম’-এর ‘এসএমই এনভেলাপ’-এর অধীনে করা হচ্ছে। এই প্লাটফর্মটি উদীয়মান বাজারে সুবিধাবঞ্চিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা দেয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অর্থায়ন করে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেছেন, ‘আইএফসির এই বিনিয়োগ ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন কাঠামো এবং এমএসএমই ব্যাংকিংয়ে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের প্রতিফলন। এই সুবিধা আমাদের সক্ষমতা বাড়াবে বিশেষ করে নারী-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ ও কৃষি খাতের এমএসএমইকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে।’
আইএফসির বাংলাদেশ ও নেপালের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ম্যানেজার উইলফ্রিড টামেগ্নন বলেছেন, ‘এমএসএমই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের ইঞ্জিন। নারী-নেতৃত্বাধীন ও কৃষি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়ালে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারবে। এর মাধ্যমে দেশজুড়ে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ত্বরান্বিত হবে।’
এমএসএমই খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে ২৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখে এবং কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ জোগায়। অথচ এই খাতে অর্থায়নের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তো বটেই, কৃষি খাতের ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও ব্যাংকঋণ পাওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। আইএফসির এই অর্থায়ন সেই বাধাটুকু কমাতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একথা নিশ্চিত, বাংলাদেশের এমএসএমই খাত যদি সত্যিকার অর্থে ঘুরে দাঁড়ায়, তাহলে তার পেছনে আইএফসি ও ব্র্যাক ব্যাংকের এই অংশীদারিত্বের অবদান থাকবেই।

