আশুলিয়ার একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় ৫৬৫ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্রয়াদেশে বড় ধরনের পতন এবং আর্থিক সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে শ্রমিক নেতারা কর্তৃপক্ষের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ছাঁটাই করা শ্রমিকদের দ্রুত কাজে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আশুলিয়ার অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড নামের কারখানাটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগ ৬ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ব ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে কারখানাটিতে ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কারখানার কার্যক্রম সচল রাখা এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০ ধারার আওতায় এই ছাঁটাই করা হয়েছে এবং সিদ্ধান্তটি ৮ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ছাঁটাই হওয়া সব শ্রমিককে আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের পাওনা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। ভবিষ্যতে কারখানার উৎপাদন বাড়লে অথবা নতুন করে শ্রমিক নিয়োগের প্রয়োজন হলে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কারখানাটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মমিনুল ইসলাম জানান, অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিটে প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে রয়েছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় গত কয়েক মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই দুপুর ২টা বা ৩টার দিকে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, এই পরিস্থিতিতে কারখানার পরিচালনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় ৫৬৫ শ্রমিককে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের সব পাওনা ১০ আগস্ট পরিশোধ করা হবে বলেও তিনি জানান।
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের একজন মো. জিয়ারুল হক পেশায় সেলাই অপারেটর। তিনি জানান, বর্তমানে তিনি দিনাজপুরে নিজ বাড়িতে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিষ্ঠানের পাঠানো খুদে বার্তার মাধ্যমে প্রথম চাকরি হারানোর বিষয়টি জানতে পারেন। পরে জানতে পারেন, কারখানার প্রধান ফটকেও এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি টানানো হয়েছে।
জিয়ারুল হক বলেন, কেন তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। হঠাৎ চাকরি হারানোর ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগের মধ্যে পড়েছেন।
তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা মানতে নারাজ শ্রমিক নেতারা। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ব্যবসায় মন্দা বা ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার বিষয়টি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়াকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেন তিনি। ছাঁটাইয়ের বিজ্ঞপ্তি অবিলম্বে প্রত্যাহার করে সব শ্রমিককে কাজে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন এই শ্রমিক নেতা।
কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ক্রয়াদেশের সংকট ও আর্থিক চাপের কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য, এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের চাকরি হারানোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। ফলে ৫৬৫ শ্রমিকের ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে আশুলিয়ার পোশাকশিল্প এলাকায় নতুন করে শ্রমিক-কর্তৃপক্ষের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

