বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) দেশের বাণিজ্যনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা ও পাঁচ দফা আনুষ্ঠানিক দর-কষাকষির পর ৪ আগস্ট ২০২৬ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। নভেম্বরে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় ঘনিয়ে আসায় এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যেসব একতরফা বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে, উত্তরণের পর তার অনেকটাই পরিবর্তিত হবে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ ভবিষ্যৎ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
তবে শুধু শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পেলেই এর সুফল পাওয়া যাবে না। আধুনিক সিইপিএ শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির চুক্তি নয়; এতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপত্তির নিয়ম, শুল্ক প্রক্রিয়া, খাদ্য ও উদ্ভিদস্বাস্থ্যসংক্রান্ত মান, কারিগরি বাণিজ্য বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয়ও রয়েছে। তাই বাংলাদেশকে এখন চুক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিশেষ করে উৎপত্তির নিয়ম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পোশাকসহ অনেক শিল্প আমদানি করা কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। সিইপিএর অধীনে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে এসব পণ্যের নির্ধারিত উৎপত্তির শর্ত পূরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জটিল নিয়ম বা অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় হলে অনেক রপ্তানিকারক কাঙ্ক্ষিত সুবিধা নিতে পারবেন না। তাই সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে রপ্তানিকারকদের উৎপত্তির নিয়ম, শুল্ক প্রক্রিয়া, খাদ্য ও পণ্যের নিরাপত্তা মান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কারিগরি মানদণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য এ সহায়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
সেবা ও ডিজিটাল বাণিজ্যেও বাংলাদেশের বড় সুযোগ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা, পেশাদারি সেবা এবং জ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে কাগজে বাজার উন্মুক্ত হলেই রপ্তানি বাড়বে না। কোন কোন সেবা খাতে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাস্তব চাহিদা রয়েছে, বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠান বা পেশাজীবীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন এবং কী ধরনের লাইসেন্স, যোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হবে—এসব বিষয় চিহ্নিত করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক সুবিধার চেয়েও দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশেও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুরোনো সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে দেউ ও দেশ গার্মেন্টসের সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও বিপণন জ্ঞান স্থানান্তরের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল, এবার আরও উন্নত শিল্পে সেই ধরনের সহযোগিতা তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম, চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত বস্ত্র ও ডিজিটাল শিল্পের মতো উচ্চমূল্যের খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। শুধু কত বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এলো, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। বরং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তর হচ্ছে, দক্ষতা বাড়ছে এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে—সেদিকে নজর দিতে হবে।
এ জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরি করতে সরবরাহকারী উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে বিদেশি বিনিয়োগ শুধু মূলধন আনবে না, দেশের শিল্পখাতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়াবে।
সিইপিএর কারণে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানিও বাড়তে পারে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেই যে চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে, এমনটা নয়। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কম শুল্কে আধুনিক যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানি করা গেলে বাংলাদেশের শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। তাই শুধু আমদানির পরিমাণ নয়, কী ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে এবং সেগুলো দেশের উৎপাদন ও রপ্তানিতে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ঝুঁকিও রয়েছে। যদি সিইপিএর ফলে মূলত দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রস্তুত ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ে, অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হবে না। তাই সরকারকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, আমদানির ধরন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দেশীয় শিল্পের ওপর প্রভাব এবং শুল্ক রাজস্ব—সবকিছুর ওপর নজর রাখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন চুক্তি সম্পাদন নয়, বরং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন, সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শুল্ক, পণ্যের মান, উৎপত্তির নিয়ম ও ডিজিটাল বাণিজ্য বিষয়ে দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে।
সিইপিএ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য একটি আলাদা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য, শুল্ক সুবিধা ব্যবহারের হার, সেবা রপ্তানি, দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষিণ কোরিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ এবং দেশীয় শিল্পের ওপর চাপ—এসব সূচক নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত সিইপিএর সাফল্য কতগুলো পণ্যে শুল্ক কমেছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। আগামী পাঁচ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা বেড়েছে, নতুন কী কী পণ্য বাজারে প্রবেশ করেছে, রপ্তানিকারকেরা কতটা শুল্ক সুবিধা ব্যবহার করতে পেরেছেন, সেবা রপ্তানি কতটা বেড়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে কতটা নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা এসেছে—এসবই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে টিকে থাকতে হলে শুধু বাজারসুবিধা পাওয়াই যথেষ্ট নয়, সেই সুবিধা কাজে লাগানোর সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ সেই সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিতভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সিইপিএ বাংলাদেশের এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

