২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা উৎপাদন বৃদ্ধির বড় কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বেশি দামে আমদানি করতে হওয়ায় সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতিও বড় হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৬৮ দশমিক ৩৫৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ২৪০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮৬ বিলিয়ন ডলার বা ১০ শতাংশের বেশি।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি তেল। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সামান্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করা গেলেও পরে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে পরিশোধিত তেল কিনতে হয়েছে।
এলএনজি আমদানিতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি অর্ধেকে নেমে যায়। ফলে চাহিদা পূরণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হয়েছে। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ৫ দশমিক ১৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩৫ বিলিয়ন ডলার।
জ্বালানির পর আমদানি ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সারের ক্ষেত্রে। এলএনজি সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় দেশের সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে ইউরিয়া আমদানির প্রয়োজন বেড়ে যায়। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতেও যুদ্ধের কারণে বাধা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সার আমদানি ব্যয় ৪২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৭১৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ২ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে ভোজ্যতেল আমদানি ব্যয় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। খাদ্যশস্যের মধ্যে গম আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ২৬ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে চাল আমদানির ব্যয় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
গত অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয়ও ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্যান্য মূলধনি পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে তৈরি পোশাক খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের আমদানি ব্যয় কমেছে। তুলার আমদানি ব্যয় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, সুতার ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, স্টেপল ফাইবারের ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং ডায়িং ও ট্রেনিং সামগ্রীর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
মাধ্যমিক পণ্যের মধ্যে পেট্রোকেমিক্যাল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রাসায়নিক পণ্যে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতেও ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে লোহা ও লৌহজাত পণ্যের আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং প্লাস্টিক ও রাবারজাত পণ্যের ব্যয় ২ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামগ্রিক খাদ্যপণ্য আমদানি ব্যয় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে ডাল আমদানিতে ব্যয় কমেছে ৩৫ শতাংশ এবং চিনিতে ১৩ শতাংশ। তবে দুধ ও ক্রিমজাত পণ্যের আমদানি ব্যয় ৭ শতাংশ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়লেও তা দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন নয়। বরং যুদ্ধ ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও কাঁচামাল বেশি দামে আমদানি করতে হওয়াই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

