সরকারি হিসাবে টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার কমছে, অথচ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দাম বাড়তির দিকেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া এই পরস্পরবিরোধী তথ্য নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অর্থনীতির নানা সূচকে দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে স্থবিরতা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে চার শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে সাময়িক হিসাব সংস্থাটি দিয়েছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়।
বিবিএসের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নেমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে, খাদ্যপণ্যে যা ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের দুই মাস অর্থাৎ জুন ও মে মাসেও এই হার ছিল তুলনামূলক বেশি—জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ ও খাদ্যে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, মে মাসে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অর্থাৎ পরপর তিন মাস ধরে সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী। গত বছরের জুলাইয়ের সঙ্গে তুলনা করলেও চলতি জুলাইয়ের হার সামান্য কম।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। তাদের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) গড় মূল্যস্ফীতি বরং বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে। মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সবজির মূল্যবৃদ্ধি। এই সময়ে জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে, তেল-লুব্রিক্যান্টে বেড়েছে প্রায় আট গুণ, আর গ্যাসে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। জুনে বিদ্যুতের দামও পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ২০ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান আরও বলছে, জুনে বাজারে থাকা ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরই দাম বেড়েছে, কমেছে মাত্র ২২টির। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি এখন কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সামগ্রিক বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজারদর পর্যালোচনায়ও একই ধরনের প্রবণতা ধরা পড়ে। চলতি বছরের সাত মাসের মধ্যে জুলাইয়েই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পণ্যের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কাঁচামরিচের দাম এক মাসেই প্রায় দ্বিগুণ হয়ে জুনের ৭১ টাকা থেকে জুলাইয়ে ১৪২ টাকায় উঠেছে। দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও সয়াবিন ও পাম অয়েল দুটোরই দাম জুলাইয়ে বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সবজির বাজারেও একই চাপ—আলু, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, শসা ও টমেটোর দাম জুলাইয়ে চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মাছের বাজারে রুই, কাতল, পাঙাশ থেকে শুরু করে ইলিশ পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের মাছের দামই ঊর্ধ্বমুখী; ইলিশের দাম মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১৮০ টাকা বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামেও লক্ষণীয় বৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল বলে জানা গেছে।
এই পার্থক্য নিয়ে জানতে চাইলে বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক জানান, দেশের ৬৪ জেলা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়। তাঁর ব্যাখ্যায়, মূল্যস্ফীতি পরিমাপে দুই ধরনের তুলনা হয়—এক বছর আগের একই মাসের সঙ্গে তুলনা এবং ঠিক আগের মাসের সঙ্গে তুলনা। ফলে বার্ষিক হিসাবে হার কমলেও মাসভিত্তিক চিত্র ভিন্ন হতে পারে। জিডিপির তথ্যমান নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের একটি দল বর্তমানে জিডিপি হিসাব পদ্ধতির ঘাটতি খতিয়ে দেখছে।
শুধু দেশীয় বিশ্লেষকরাই নন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) বাংলাদেশের পরিসংখ্যানের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত তাদের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, বাণিজ্য ও মুদ্রানীতি সংক্রান্ত তথ্যে দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ভোক্তা মূল্যসূচকের পণ্য-ঝুড়ির পরিধি অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করে সংস্থাটি সার্বিক মূল্যস্ফীতি পরিসংখ্যানকে মাঝারি মানের রেটিং দিলেও এর কাভারেজের দিক থেকে দুর্বল রেটিং দিয়েছে। জিডিপি পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রেও একই রকম দুর্বল মূল্যায়ন করেছে আইএমএফ।
একটি বিষয় লক্ষণীয়—বিবিএসের মূল্যস্ফীতি হিসাবের পণ্য-ঝুড়িতে এখন ৭৪৯টি পণ্য যুক্ত, যা আগে ছিল ৪২০টি। এই ঝুড়িতে আলমারি বা ল্যাপটপের মতো এমন পণ্যও আছে যা সাধারণ মানুষ কালেভদ্রে কেনেন। বিশ্লেষকদের মতে, ঝুড়ির গঠন ও ওজন পরিবর্তনের কারণে নিত্যপণ্যের প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি সার্বিক সূচকে সেভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একজন সম্মাননীয় ফেলো মনে করিয়ে দেন, মূল্যস্ফীতির হার কমা মানেই জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়া নয়—আগের বছরগুলোর উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দাম এমনিতেই অনেক ওপরে উঠে গেছে, আর এখন সেই উঁচু স্তরের ওপরই নতুন করে দাম বাড়ছে। তাঁর মতে, শাকসবজি, ডিম, মাছ, চাল-ডালের মতো নিত্যপণ্যের দাম সার্বিক হারের চেয়ে বেশি বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর প্রকৃত চাপ সরকারি গড় হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। জিডিপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সংকটে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়েও। বিবিএসের জরিপ পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আরও সংস্কার জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি, যা ইতিমধ্যে একটি শ্বেতপত্রেও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক প্রধান অর্থনীতিবিদ, যিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত, মনে করেন—অতীতে সরকারি তথ্য নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি, ফলে তথ্য সঠিক হলেও মানুষের আস্থার সংকট থেকেই যেতে পারে। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারণের ভিত্তি যেহেতু এসব পরিসংখ্যান, তাই তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই আস্থাহীনতা দূর হবে না।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, বর্তমান সরকারের আমলে তথ্য বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। তিনি জানান, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে তা একাধিকবার পর্যালোচনা ও একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে, যাতে সরকার সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করতে পারে।
তবে সামগ্রিক চিত্র বলছে, সরকারি পরিসংখ্যান আর বাজারের বাস্তবতার মধ্যে এই ব্যবধান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সংশয় সহসাই কাটছে না। বিবিএসের কাঠামোগত সংস্কার ও তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতির উন্নয়ন দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত এই আস্থার ঘাটতি অর্থনীতির নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

