চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসেপে যোগ দিতে জোরালো তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। এই জোটের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব জমা দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাঠামোকে আরসেপের উচ্চমানের বাণিজ্য নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সংস্কার কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের আরসেপে যোগদান এখন প্রায় নিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে জোটভুক্ত সব দেশের কাছ থেকেই সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গতকাল অস্ট্রেলিয়াও এই সমর্থন জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আরসেপে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি বাণিজ্য ব্লকে প্রবেশাধিকার পাবে, যার ফলে সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্যমতে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি বাড়াতে নতুন বাজার অপরিহার্য—আর এই ক্ষেত্রে আরসেপ জোটে যুক্ত হতে পারলে রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর আরসেপে যোগদানের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, যখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সম্মতিপত্র পাঠায়। বাংলাদেশের পাশাপাশি এই জোটে যোগ দিতে আবেদন করেছে শ্রীলঙ্কা, চিলি ও হংকংও।
অস্ট্রেলিয়ায় সফররত বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান জানান, সম্প্রতি মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ও অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে উভয় দেশের কাছে আরসেপে যোগদানে সমর্থন চাওয়া হয়, যা তারা আশ্বস্ত করে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকেও এই সমর্থন চাওয়া হয়েছে, যারা আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসেপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সবশেষে গতকাল অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকেও একই সমর্থন পাওয়া গেছে।
২০২০ সালের নভেম্বরে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ মিলিয়ে স্বাক্ষরিত হয় আরসেপ চুক্তি, যা কার্যকর হয় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। এই জোটের অর্থনৈতিক আয়তন বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে পরিণত করেছে—এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও এর পরিধি বড়। জোটভুক্ত ১৫টি দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৩০ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ, আর বাজারের আকার প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী দুই দশকের মধ্যে সদস্য দেশগুলোকে অধিকাংশ আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে তুলে নিতে হবে। টেলিযোগাযোগ, মেধাস্বত্ব, আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও পেশাদার সেবার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও এই চুক্তির আওতাভুক্ত। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো ‘রুলস অব অরিজিন’ সংক্রান্ত নতুন সংজ্ঞা, যা নির্ধারণ করবে কোন দেশ থেকে পণ্য আসছে তার ভিত্তিতে শুল্ক সুবিধা—আর এই সুবিধা পেতেই আরসেপে যুক্ত হতে চাইছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈঠক করে। এই বৈঠকে আরসেপ সদস্যপদ, এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত সময় এবং দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশটির নীতিগত প্রভাবের কথা তুলে ধরে বিশেষ সমর্থন চাওয়া হয়, পাশাপাশি সংবেদনশীল শিল্প খাত সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক নমনীয়তার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর দেশের চলমান আর্থসামাজিক রূপান্তর, রিজার্ভ স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়টিও তুলে ধরে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়, যা বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য ও কৃষি যন্ত্রপাতি রপ্তানির সুযোগ পাবে, আর বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পে স্থিতিশীল বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারবে। এই আলোচনার প্রেক্ষিতে নিউজিল্যান্ড উভয় ইস্যুতেই বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
এ বিষয়ে একজন যুগ্ম সচিব জানান, আরসেপে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং জোটের সব দেশের সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া গেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসেপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

