সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নিযুক্ত ঠিকাদারেরা নিয়মিতভাবে ভ্যাট ও কর পরিশোধ করছেন কি না, তা যাচাইয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এই লক্ষ্যে সংস্থাটির গোয়েন্দা শাখা—সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল—বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের কাছ থেকে চলমান প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।
সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে গোয়েন্দা সেলটি। চিঠিতে চলমান প্রকল্পের নাম, প্রকৃতি, অর্থায়নের উৎস, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, তাদের ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর ও কর শনাক্তকরণ নম্বর, প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং শুরুর তারিখসহ নানা তথ্য চাওয়া হয়েছে। এরপর সড়ক বিভাগ তাদের অধীন কর্মকর্তাদের এসব তথ্য জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
চিঠিতে গোয়েন্দা সেল জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন তথ্য এসেছে যে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ঠিকাদারেরা সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব ঠিকমতো জমা দিচ্ছেন না। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই প্রকল্প ও ঠিকাদারভিত্তিক এই তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর ফলে শুধু প্রকল্পের আর্থিক আকার নয়, কোন ঠিকাদার কোন প্রকল্পে যুক্ত এবং তাঁদের কর-ভ্যাট নিবন্ধনের অবস্থা কেমন—তা একসঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হবে।
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী এই সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে অন্তত আটটি বিষয়ে তথ্য দিতে বলা হয়েছে—প্রকল্পের নাম, ধরন, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বা উৎস, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও নিবন্ধন নম্বর, মোট ব্যয় এবং প্রকল্প শুরুর তারিখ। এর মধ্যে অর্থায়নের উৎস হিসেবে সরকারি বরাদ্দ, বৈদেশিক সহায়তা নাকি অন্য কোনো মাধ্যম—তাও স্পষ্ট করে জানাতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা সেলের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে সেই তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নম্বর মিলিয়ে দেখলে সহজেই বোঝা যাবে, তারা প্রকৃত অর্থে কতটা কর ও ভ্যাট পরিশোধ করছে। অর্থাৎ সরকারি প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব ঠিকমতো আদায় হচ্ছে কি না—সেটিই এই অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য।
এ প্রসঙ্গে সুশাসন-বিষয়ক একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী প্রধান এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেরিতে নেওয়া পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল, তবে এখন হলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের উদ্বেগজনক কর-জিডিপি অনুপাত সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তদন্তে যদি ঠিকাদার-ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকির সঙ্গে রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ কারও যোগসাজশের প্রমাণ মেলে, তখন সংস্থাটি নিজের ঘর সামলাতে কতটা আন্তরিক হবে, সেটাই দেখার বিষয়।
শুধু সড়ক বিভাগ নয়, একই ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, রেলওয়ে, নৌপরিবহন, পানিসম্পদ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকেও। কারণ সরকারের উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় সড়ক, সেতু, রেলপথ, স্থানীয় অবকাঠামো, নৌপথ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন নির্মাণকাজে, আর এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপের মধ্যেই এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল প্রায় দুই লাখ নয় হাজার কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা বাড়িয়ে তিন লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী মোট বাজেটের প্রায় সাড়ে ৩৩ শতাংশ ব্যয় হবে উন্নয়ন খাতে, যা আগের অর্থবছরে ছিল পৌনে ২৮ শতাংশের কাছাকাছি।
গত অর্থবছরের প্রথম এগারো মাসে রাজস্ব বোর্ড আদায় করেছে প্রায় তিন লাখ ষাট হাজার কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে আঠারো শতাংশ, যদিও আগের বছরের তুলনায় আদায় বেড়েছে দশ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ—প্রায় ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা—আদায় করতে হবে রাজস্ব বোর্ডকেই।
সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট আয়করের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে উৎসে ও অগ্রিম কর থেকে, আর এর প্রায় ২২ শতাংশ আসে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় কেটে রাখা উৎসে করের মাধ্যমে। তবে এই অংশকে পুরোপুরি সরকারি প্রকল্পনির্ভর রাজস্ব হিসেবে ধরা যাবে না, কারণ ঠিকাদারি ও সরবরাহ ব্যবসার সব লেনদেন সরাসরি সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নয়। তারপরও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপে সব ধরনের রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে তৎপরতা জোরদার করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

