দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্পট বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির সুযোগ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহকারীদের তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানো হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, নতুন সরবরাহকারীদের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৬ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর।
পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় আবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো হয়েছে। এর আগে ২৯ আগস্ট নতুন সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল।
কেন বাড়ানো হচ্ছে সরবরাহকারীর সংখ্যা
বাংলাদেশ বর্তমানে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্পট বাজার থেকে এলএনজি কেনার ওপর আগের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিভিন্ন বাধা এবং চুক্তিভিত্তিক গ্যাস সরবরাহে সমস্যার কারণে এই নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার লক্ষ্য হলো অনুমোদিত এলএনজি সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ানো, যাতে বেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারে এবং প্রতিযোগিতা বাড়ে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে কম দামে এলএনজি কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বর্তমানে স্পট এলএনজি দরপত্রে নিয়মিত অংশ নেয় এমন সরবরাহকারীর সংখ্যা সীমিত। ফলে সরবরাহকারী বাড়ানো গেলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্পট বাজার থেকে বাড়ছে এলএনজি আমদানি
বাংলাদেশে বর্তমানে যে স্পট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, তার গুণগত মান সাধারণত ১ হাজার ২৫ থেকে ১ হাজার ১০০ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট প্রতি ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে।
আমদানি করা এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার পর দেশের নিজস্ব উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয়।
স্পট বাজারের এলএনজি সাধারণত সরাসরি জাহাজে সরবরাহ করা হয়। এসব জাহাজের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ঘনমিটার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর বেড়েছে নির্ভরতা
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কার কারণে বাংলাদেশ স্পট বাজার থেকে এলএনজি কেনার পরিমাণ বাড়িয়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ স্পট বাজার থেকে প্রায় ৫০টি এলএনজি কার্গো কিনেছে। এর আগে ২০২৫ সালে স্পট বাজার থেকে মোট ৪৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বর্তমানে পেট্রোবাংলা শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য বড় গ্যাস ব্যবহারকারী খাতে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর দেশে মোট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৫৮৩ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। এর মধ্যে পুনঃগ্যাসায়িত এলএনজির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৮৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
অন্যদিকে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন।
অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই সরকার স্পট এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন সরবরাহকারী যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহকারী বাড়ানো হলে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সংগ্রহ সহজ হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট সমাধানের জন্য স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
স্পট এলএনজি বাজারে নতুন সরবরাহকারী যুক্ত করার উদ্যোগ মূলত তাৎক্ষণিক গ্যাস সংকট সামাল দেওয়ার একটি পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরবরাহকারী যুক্ত হলে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে কতটা পরিবর্তন আসে।

