দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে বিদায়ী অর্থবছরে। অপরিশোধিত তেল ও বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে দশ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের চৌদ্দ শতাংশেরও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
আগের অর্থবছরের তুলনায় এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে—এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে একশ সাত শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রতি সাত ডলারের প্রায় এক ডলারই এখন খরচ হচ্ছে শুধু জ্বালানি খাতে। বর্তমান বিনিময় হারে এই অর্থ প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকার সমান।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ব্যয় আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে, যা তৈরি হয়েছিল করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সময়, যখন জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তেলের দামও লাফিয়ে বেড়েছিল।
একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, মূলত চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধির যৌথ প্রভাবেই জ্বালানি আমদানি ব্যয় এতটা বেড়েছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকলে ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির তুলনায় জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল বহুগুণ বেশি। মোট আমদানি ব্যয় সাড়ে দশ শতাংশ বেড়ে প্রায় পঁচাত্তর বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আমদানির অন্যান্য প্রধান খাতের মধ্যে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে পনেরো শতাংশের বেশি, মূলধনি পণ্য বেড়েছে প্রায় সাত শতাংশ এবং খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে প্রায় বারো শতাংশ। তবে ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমেছে সাড়ে এগারো শতাংশের মতো। তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল, লোহা-ইস্পাত ও প্লাস্টিক-রাবার জাতীয় পণ্যের আমদানিও কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে সার, তেলবীজ, রাসায়নিক ও ওষুধ পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি এবং দেশীয় চাহিদার সম্প্রসারণ—এই দুই কারণেই জ্বালানি আমদানি ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আমদানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যদিও পুরো অর্থবছরের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি। আমদানি করা জ্বালানির মধ্যে ছিল ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল।
অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে সোয়া বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, আর পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে একশ নয় শতাংশের বেশি, যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে নয় বিলিয়ন ডলারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে পরিশোধিত পণ্য আমদানির মাধ্যমে, নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা তুলনামূলক সীমিত।
অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম অনেক বেশি হারে বেড়েছে—প্রায় সাড়ে সতেরো শতাংশ, যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে সাড়ে দশ শতাংশের মতো। যেহেতু বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশই পরিশোধিত জ্বালানি, তাই এই মূল্যপার্থক্য দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিশোধন মার্জিন সরবরাহ সংকট বা চাহিদা বৃদ্ধির সময় আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মহামারি-পরবর্তী সময় থেকেই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা লেগেই আছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর একবার দাম বেড়েছিল, আর চলতি অর্থবছরেও বাজারে বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় একপর্যায়ে দাম শতাধিক ডলার ছাড়িয়ে যায়, পরে তা আবার নিম্নমুখী হয়ে বর্তমানে আশির ঘরে অবস্থান করছে।
এই রেকর্ড ব্যয়ের মধ্যেই সম্প্রতি দেশে সাময়িক জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, যার ফলে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের মতে, মূলত সংকটের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে ভোক্তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার কারণেই এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে অন্তত দেড় মাসের মজুত বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক বাজার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে, যদিও কয়েক মাস আগে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম সামান্য বাড়ানো হয়েছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।

