জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনলাইন ভ্যাট ফেরত ব্যবস্থা চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সফটওয়্যার হালনাগাদের কারণে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আটকে থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কার্যকরী মূলধন আটকে যাচ্ছে। এতে ঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয় এবং ব্যবসার নগদ অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এনবিআরের নথি অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফেরত পাওনা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের হিসাবে অপেক্ষমাণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বেশি। তাদের দাবি, ৮ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ফেরত পাওনা রয়েছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এই জটের মধ্যে পড়েছে।
সমস্যাটির গুরুত্ব বোঝা যায় এনবিআরের নিজের ঘোষণার সঙ্গে তুলনা করলে। গত বছরের নভেম্বরে এনবিআর অনলাইন ভ্যাট ফেরত ব্যবস্থা চালু করে। এরপর জানুয়ারিতে চালু করা হয় স্বয়ংক্রিয় ফেরত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে অনুমোদিত অর্থ করদাতার ব্যাংক হিসাবে সরাসরি পাঠানোর কথা। এই ব্যবস্থায় এনবিআরের ভ্যাট ব্যবস্থা, অর্থ বিভাগের আইবাস++ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিইএফটিএনের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ কাগজপত্র নিয়ে অফিসে ঘোরার বদলে পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করার লক্ষ্য ছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেই ডিজিটাল ব্যবস্থাই এখন ফেরতের গতি কমিয়ে দিয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভ্যাট ফেরত প্রক্রিয়ার সফটওয়্যার মডিউল হালনাগাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভুয়া কাগজপত্র বা অনিয়মের মাধ্যমে কেউ যাতে ফেরত নিতে না পারে, সে জন্য যাচাইয়ের নতুন ব্যবস্থাও তৈরি করা হচ্ছে। এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আবার শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, অনিয়ম ঠেকানোর ব্যবস্থা করা জরুরি হলেও বৈধভাবে পাওনা অর্থ আটকে রাখার দায়ভার কেন ব্যবসাকেই নিতে হবে? কোনো প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফেরত পাওনা থাকলে সেটি মূলত তার ব্যবসায় ব্যবহারের কথা। সেই টাকা দীর্ঘদিন আটকে গেলে প্রতিষ্ঠানকে অন্য উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, সুদ দিতে হয় এবং নতুন বিনিয়োগ বা উৎপাদনে ব্যবহারের মতো নগদ অর্থ কমে যায়। ফলে একটি প্রশাসনিক জটিলতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচে গিয়ে পড়ে।
এখানে বিষয়টি শুধু কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে থাকার নয়। ভ্যাট ব্যবস্থায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগে কর পরিশোধ করে, পরে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে অতিরিক্ত বা প্রাপ্য অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে। তাই ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে করব্যবস্থার ওপর ব্যবসায়ীদের আস্থাতেও প্রভাব পড়ে। এনবিআর নিজেও অনলাইন ফেরত ব্যবস্থা চালুর সময় বলেছিল, এর মাধ্যমে সময় ও খরচ কমবে এবং ফেরত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
আরেকটি বিষয় হলো, এনবিআরের এই উদ্যোগটি শুধু একটি সফটওয়্যার প্রকল্প হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি ধরা পড়বে না। ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক হয়, যখন সেটি নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও কমায়। সফটওয়্যার হালনাগাদের কারণে যদি বৈধ পাওনা পরিশোধ বন্ধ থাকে, তাহলে কাগজের ফাইলের বদলে ডিজিটাল জট তৈরি হয়। এতে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক সমস্যার ধরন বদলায়, কিন্তু ব্যবসার ভোগান্তি কমে না।
বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ক্ষেত্রে এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কর আদায় বাড়াতে এনবিআর যেমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়ম মেনে কর দেওয়ার প্রত্যাশা করে, তেমনি সরকারের কাছ থেকেও ব্যবসায়ীদের পাওনা সময়মতো পরিশোধের প্রত্যাশা থাকে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরত পেতে দেরি হওয়া মানে শুধু হিসাবের খাতায় একটি পাওনা পড়ে থাকা নয়; সেই অর্থ উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সরবরাহকারীকে পরিশোধ কিংবা নতুন বিনিয়োগে ব্যবহার করা যায় না।
এখন এনবিআরের জন্য বড় পরীক্ষা হবে অনলাইন ভ্যাট ফেরত ব্যবস্থাকে দ্রুত সচল করা এবং একই সঙ্গে এমন যাচাইব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে অনিয়ম ঠেকানো যায় কিন্তু বৈধ দাবিদারদের অর্থ আটকে না থাকে। ডিজিটাল ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসার সময়, খরচ ও হয়রানি কমানো। সেটি যদি বাস্তবে করতে হয়, তাহলে সফটওয়্যার হালনাগাদের পাশাপাশি ফেরত পাওয়ার সময়সীমা, জবাবদিহি এবং অনুমোদিত দাবির দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও স্পষ্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন। নইলে ব্যবসা সহজ করার যে উদ্যোগ দিয়ে অনলাইন ভ্যাট ফেরত ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, সেটিই উল্টো ব্যবসার নগদ অর্থ আটকে রাখার নতুন কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

