বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে জ্বালানি সংকট এখন আর সাময়িক কোনো অস্বস্তির বিষয় নয়। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে জ্বালানির সমস্যা সরাসরি অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে।
শহর থেকে গ্রাম, পরিবার থেকে কারখানা—প্রায় সব স্তরেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কোথাও গ্যাসের চাপ নেই, কোথাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোথাও শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। জ্বালানির এই ঘাটতি দীর্ঘ হলে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর এবং সরকারের রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই এর চাপ বাড়তে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২.০৩ বিলিয়ন ঘনফুটে। অথচ দেশে স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক গ্যাস।
এত কম সরবরাহ গত ১৬ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন বলেও জানানো হয়েছে।
এই একটি পরিসংখ্যানই বর্তমান সংকটের গভীরতা বোঝার জন্য যথেষ্ট। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, আবাসিক ব্যবহার এবং বহু বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের সরবরাহ অর্ধেকে নেমে গেলে এর চাপ একটি খাতে আটকে থাকে না; পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিদ্যুৎ বাঁচাতে শিল্পের গ্যাস কমছে
সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়েছে।স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দৈনিক প্রায় ৬৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেত। বর্তমানে সেই সরবরাহ বাড়িয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদে এই সিদ্ধান্তের যুক্তি আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খুব বেশি কমে গেলে বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, অফিস, ব্যবসা, শিল্প—সবখানেই বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে অতিরিক্ত গ্যাস দেওয়া তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার একটি উপায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত গ্যাস আসছে কোথা থেকে?বাস্তবে শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতে সরবরাহ কমিয়েই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অংশ বাড়াতে হয়েছে।
মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে দৈনিক প্রায় ১.৬ থেকে ১.৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে গিয়ে শিল্প ও অন্যান্য গ্রাহকের ওপর বড় অংশের চাপ স্থানান্তর করা হয়েছে।এটি হয়তো কয়েক দিনের জন্য কার্যকর হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় এই পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক।
কারখানা বন্ধ হলে ক্ষতি শুধু মালিকের নয়
গ্যাসের অভাবে একটি কারখানার উৎপাদন কমে গেলে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি ওই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবসায়িক সমস্যা। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বড়।
একটি কারখানার উৎপাদন কমলে কাঁচামালের চাহিদা কমে। পরিবহন ব্যবসায় প্রভাব পড়ে। শ্রমিকের কাজ কমে। রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ে। সরকারের কর ও শুল্ক আদায় কমতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।এটি উদ্বেগজনক।
কারণ উৎপাদনে প্রায় অর্ধেক পতন মানে শুধু বর্তমান মাসের বিক্রি কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ, শ্রমিক ধরে রাখা, উৎপাদন ব্যয়, ঋণের কিস্তি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রশ্নও যুক্ত।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, সুতা উৎপাদন, ইস্পাত, কাচ এবং সিরামিকের মতো খাত নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।এসব শিল্পে শুধু গ্যাস থাকা যথেষ্ট নয়; নির্দিষ্ট চাপ এবং ধারাবাহিক সরবরাহও প্রয়োজন।
কাচ শিল্পের মতো খাতে সংকট আরও ভয়াবহ
সব কারখানার উৎপাদন পদ্ধতি এক নয়। কোনো কোনো শিল্প কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রেখে আবার সহজেই চালু করা যায়। কিন্তু কাচ উৎপাদনের মতো শিল্পে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
কাচ কারখানার চুল্লি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ওই সময়ের উৎপাদন বন্ধ হয় না; চুল্লির বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে অতিরিক্ত অর্থ, সময় এবং কারিগরি প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।
ফলে কয়েক দিনের গ্যাস সংকট একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কয়েক মাসের আর্থিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
এখানেই বর্তমান জ্বালানি সমস্যার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি। জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন সব শিল্পে সাময়িক ক্ষতি তৈরি করে না। কিছু খাতে এর দীর্ঘস্থায়ী ফল দেখা দিতে পারে।
মহেশখালীর টার্মিনাল সংকটে দুর্বলতা প্রকাশ
বর্তমান সংকটকে আরও কঠিন করেছে মহেশখালী এলাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামোগত সমস্যা।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামিটের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
একই সময়ে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান গ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
এর আগেই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট এনার্জির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে দেশের আমদানি করা গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ সামিটের টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আর এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কেন এত সীমিত সংখ্যক অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করবে, যেখানে একটি টার্মিনালে সমস্যা হলেই পুরো জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যায়?
বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা থাকলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সেই গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য বিকল্প এবং নিরাপদ অবকাঠামোও প্রয়োজন।
একই উৎস বা একই ধরনের সীমিত স্থাপনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আমদানিনির্ভরতা কেন উদ্বেগের
বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় গত কয়েক বছরে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।কিন্তু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে পারে। জাহাজ চলাচলে সমস্যা হতে পারে। প্রতিকূল আবহাওয়া সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বীমা বা চুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংঘাত বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় জ্বালানি বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।
এমনকি দেশে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জ্বালানি পাওয়া নিশ্চিত নাও হতে পারে।তাই আমদানি করা গ্যাস প্রয়োজন হলেও সেটিকে একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখা নিরাপদ নয়।
গ্যাস বাড়িয়েও বিদ্যুৎ সংকট কাটছে না
সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্থিতিশীল রাখা যাচ্ছে না।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়।গ্যাসের সংকট এখন আর কেবল গ্যাসের সমস্যা নয়।এটি ধীরে ধীরে গ্যাস ও বিদ্যুতের যৌথ সংকটে পরিণত হচ্ছে।
গ্যাস না থাকলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। বিদ্যুৎ কমে গেলে শিল্পের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। আবার শিল্পের গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরিয়ে দিলে শিল্পে সরাসরি উৎপাদন কমে যায়।
অর্থাৎ যে খাতেই জ্বালানি দেওয়া হোক, অন্য একটি খাতে চাপ তৈরি হচ্ছে।
এটি মূলত সরবরাহ ঘাটতির সমস্যা। সীমিত সম্পদ এক খাত থেকে আরেক খাতে সরিয়ে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু মোট ঘাটতি দূর না হলে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
শিল্পের চাহিদা কমে গেলে সেটি সুখবর নয়
কোনো কোনো পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়াকে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমার লক্ষণ মনে হতে পারে।
কিন্তু শিল্পকারখানা বন্ধ থাকার কারণে যদি বিদ্যুতের চাহিদা কমে, সেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
বরং এর অর্থ হতে পারে উৎপাদন কমছে।
একটি অর্থনীতিতে কারখানা কম চললে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহার কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে পণ্য উৎপাদন, রপ্তানি, আয় এবং কর্মসংস্থানও কমতে পারে।
তাই শুধু বিদ্যুতের ঘাটতির হিসাব দেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না।
জ্বালানি নীতিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা অনিশ্চয়তা
জ্বালানির ঘাটতি যেমন সমস্যা, তেমনি বড় সমস্যা হলো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা।
একজন শিল্প উদ্যোক্তা যদি জানেন আগামী সাত দিন গ্যাস কম থাকবে, তাহলে তিনি অন্তত উৎপাদনের সময়সূচি বদলাতে পারেন। শ্রমিকের পালা ঠিক করতে পারেন। ক্রেতাকে আগেই জানাতে পারেন। কাঁচামাল সংগ্রহের পরিকল্পনা বদলাতে পারেন।
কিন্তু যদি কেউ জানতেই না পারেন আগামীকাল গ্যাস থাকবে কি না, তাহলে পরিকল্পনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ীদের স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন—
কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে,
কোন শিল্প অগ্রাধিকার পাবে,
সংকট কত দিন চলতে পারে,
কখন সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে,
এবং সংকটকালীন সময়ে শিল্পকারখানাকে কীভাবে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে হবে।
অস্পষ্টতা বিনিয়োগের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
কোনো উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত হতে না পারেন তাঁর কারখানা আগামী মাসে প্রয়োজনীয় গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাবে কি না, তাহলে তিনি নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়বেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
জমি, শ্রম এবং বাজারের পাশাপাশি এখন জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতাও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জরুরি ভিত্তিতে কী করা প্রয়োজন
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা।
সামিটের টার্মিনালের মাধ্যমে অতিরিক্ত চালান আনার সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগাতে হবে। তবে একটি অতিরিক্ত চালান এনে কয়েক দিনের ঘাটতি পূরণ করাকে স্থায়ী সমাধান ভাবার সুযোগ নেই।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
একাধিক টার্মিনাল কার্যকর থাকলে একটি স্থাপনায় সমস্যা হলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা একই মাত্রায় ঝুঁকিতে পড়বে না।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পুরো ব্যবস্থাপনায়ও আরও সমন্বয় দরকার।
চালান আনা থেকে শুরু করে জাহাজ ভেড়ানো, বীমা, ক্রয়চুক্তি, আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ—সব ধাপে আগাম প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
শিল্পের জন্য প্রয়োজন আলাদা জরুরি পরিকল্পনা
বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গ্যাস দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু শিল্পকে দীর্ঘ সময় গ্যাসবঞ্চিত রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।
তাই শিল্প খাতের জন্য একটি পরিষ্কার জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সব শিল্পের জ্বালানি প্রয়োজন এক নয়।
কিছু শিল্প সাময়িকভাবে উৎপাদন কমাতে পারে। আবার কিছু শিল্পে সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ করা হলে যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন কাঠামোর বড় ক্ষতি হতে পারে।
এ কারণে জ্বালানি বণ্টনের ক্ষেত্রে শিল্পগুলোর প্রকৃতি, রপ্তানি গুরুত্ব, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কারিগরি ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
স্বচ্ছ নীতির মাধ্যমে কোন পরিস্থিতিতে কোন খাত কতটুকু গ্যাস পাবে—তা আগেই নির্ধারণ করা গেলে সংকট ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে আবার গুরুত্ব দিতে হবে
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম বড় প্রশ্ন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান।
আমদানি করা গ্যাস দিয়ে তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎসের বিকল্প তৈরি না হলে আমদানিনির্ভরতা বাড়তেই থাকবে।
তাই নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, সম্ভাবনাময় এলাকায় জরিপ, নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
এখানে শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া নয়, অনুসন্ধান ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি খাতে সিদ্ধান্তের ফল সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। আজ একটি অনুসন্ধান প্রকল্প শুরু করলে তার ফল পেতে কয়েক বছর লাগতে পারে।
তাই সংকট দেখা দেওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু করলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেও মূল পরিকল্পনায় আনতে হবে
বাংলাদেশে গ্যাস ও আমদানি করা জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভূমিকা বাড়ানো প্রয়োজন।
এটি রাতারাতি গ্যাসের বিকল্প হয়ে যাবে না। তবে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এলে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদনের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, সরকারি ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং উপযুক্ত জমি বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে শক্তির অপচয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো মানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা নয়, কিন্তু একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন সম্ভব হলে সামগ্রিক চাহিদার চাপ কমে।
সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ
দেশে জ্বালানি থাকলেই সংকট শেষ হয় না। সেই জ্বালানি বা বিদ্যুৎ সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানোও জরুরি।
পুরোনো সঞ্চালন ব্যবস্থা, বিতরণে সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা অথবা কোনো একটি অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনায় উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ—চারটিকেই একই কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
সমস্যার মূলে সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি
বর্তমান সংকট আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে—গ্যাস ও বিদ্যুৎকে আলাদা আলাদা খাত হিসেবে পরিকল্পনা করলে সমস্যা সমাধান কঠিন হবে।
- গ্যাসের বড় অংশ যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
- বিদ্যুৎ প্রয়োজন শিল্পে।
- শিল্পের নিজস্ব উৎপাদনেও আবার সরাসরি গ্যাস লাগে।
- অর্থাৎ একটির সঙ্গে অন্যটি গভীরভাবে যুক্ত।
তাই গ্যাসের পরিকল্পনা আলাদা, বিদ্যুতের পরিকল্পনা আলাদা এবং শিল্পের পরিকল্পনা আলাদা হলে বাস্তব সংকটে গিয়ে সিদ্ধান্তগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা, যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ, উৎপাদন সক্ষমতা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন একই কাঠামোর মধ্যে থাকবে।
শুধু সংকট সামলানো নয়, সংকটের আগেই প্রস্তুতি দরকার
বাংলাদেশে জ্বালানি ঘাটতি নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে গ্যাস সরবরাহ কমেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ এসেছে এবং শিল্প খাতকে রেশনিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সমস্যা হলো, প্রতিবারই যদি সাময়িক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা থেকেই যায়।
একবার আমদানি বাড়ানো হলো, আরেকবার শিল্পের গ্যাস কমানো হলো, অন্য সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো হলো—এসব পদক্ষেপ জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প নয়।
একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য এমন জ্বালানি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে একটি টার্মিনালে সমস্যা হলে পুরো দেশে সংকট তৈরি হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে না এবং একটি খাতকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য খাতকে দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হবে না।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত
বাংলাদেশ যদি আগামী বছরগুলোতে শিল্পায়ন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, তাহলে জ্বালানি সরবরাহকে সেই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী প্রস্তুত করতে হবে।
নতুন কারখানা মানে নতুন বিদ্যুৎ চাহিদা।
শিল্প সম্প্রসারণ মানে আরও গ্যাস বা বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজন।
নতুন নগরায়ণ মানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক চাহিদাও বাড়বে।
অর্থনীতি যত বড় হবে, জ্বালানির ওপর চাপ তত বাড়বে।
তাই বর্তমান চাহিদা মেটাতে পারাই যথেষ্ট নয়; পাঁচ বা দশ বছর পরের চাহিদার জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে।
বর্তমান সংকট একটি বড় সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র কয়েক দিনের সরবরাহ সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকাশ করেছে।
দৈনিক গ্যাস সরবরাহ যখন ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুটের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২.০৩ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, শিল্প উৎপাদন যখন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা বলা হয় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়িয়েও লোডশেডিং পুরোপুরি ঠেকানো যায় না—তখন এটি শুধু একটি খাতের সংকট থাকে না।
এটি জাতীয় অর্থনীতির সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।
তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করাই এখন প্রধান কাজ। কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে।
- নতুন কূপ ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
- তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস গ্রহণের অবকাঠামোকে আরও বৈচিত্র্যময় ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে হবে।
- জ্বালানির অপচয় কমাতে হবে।
- সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শিল্পনীতিকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শিল্প বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ ঠিক রাখা যেমন দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়, তেমনি বিদ্যুতের স্থিতিশীলতা উপেক্ষা করে শিল্প চালানোও সম্ভব নয়।দুটিই একই অর্থনীতির ভিত্তি।
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আজকের সমস্যার সমাধান শুধু আজকের ঘাটতি পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবার ফিরে আসতে পারে।
দেশের প্রয়োজন এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা, যা শুধু চাহিদা পূরণ করবে না; বরং কোনো দুর্ঘটনা, আমদানি বিঘ্ন, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারবে।
কারণ নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। আর শক্তিশালী শিল্পভিত্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও নিরাপদ নয়।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই—জ্বালানি নিরাপত্তাকে আর শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটিকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

