চামড়ার এক ডলার, যা কারো পকেটে যায় না
সাভারের ট্যানারি পাড়া থেকে প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া চীনে যায় মাত্র পঁয়তাল্লিশ থেকে পঁচাত্তর সেন্টে। একটা আন্তর্জাতিক পরিবেশ-সনদ থাকলে সেই একই চামড়া বাংলাদেশ নিজেই বিক্রি করতে পারত দেড়-দুই ডলারে। সনদ মেলে না, কারণ সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য-শোধনাগার তার সক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ বর্জ্য সামলাতে পারে না, বিশেষত কোরবানির মৌসুমে। দুই দশকের বেশি সময় আর প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ করেও প্রকল্পটা কার্যকর হয়নি; এখন সমাধান হিসেবে দায়িত্ব এক সরকারি সংস্থা থেকে আরেক সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, অথচ শোধনাগার যেখানে ছিল সেখানে ই আছে।
এই গল্পটা একটা রূপক হিসেবে দেখা দরকার। প্রশ্নটা কেবল একটা ট্যানারি বা একটা সংস্থার দক্ষতা নিয়ে নয়—প্রশ্নটা হলো, বাংলাদেশ যে দাম বানাতে পারত, সেটা কেন বারবার অন্যের হাতে চলে যাচ্ছে।
ইপিজেড-কেন্দ্রিক মিথ ভাঙা দরকার
প্রচলিত ধারণা হলো, বিদেশি বিনিয়োগ আর ইপিজেড-ই বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, আর এদের চাপেই দেশি শিল্প বাড়তে পারেনি। বাস্তব সংখ্যা এই ধারণাকে সমর্থন করে না। দেশের আটটি ইপিজেড মিলিয়ে মোট রপ্তানির মাত্র সাড়ে সতেরো শতাংশ আসে, শ্রমিক সংখ্যা ও পোশাকশিল্পের মোট কর্মীর তুলনায় সামান্য। পোশাকশিল্পের সিংহভাগ কারখানা আসলে সাধারণ জমিতে, দেশি মালিকের হাতে গড়ে উঠেছে—এমনকি প্রথম রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইপিজেড চালু হওয়ার বছর কয়েক আগে। বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্কও অর্থনীতির আকারের তুলনায় নগণ্য। অর্থাৎ দেশি শিল্পকে যা আটকে রেখেছে, তার উৎস বিদেশি প্রতিযোগিতা নয়—দেশের নিজস্ব নীতি কাঠামো।
শুল্কের সিঁড়ি: যেখানে আসল ফাঁদ লুকানো
সমস্যার মূল জায়গাটা হলো শুল্ক-কাঠামোর নকশা। বাংলাদেশে শুল্ক বসানো হয় স্তরে স্তরে—কাঁচামালে সবচেয়ে কম, মাঝারি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে (সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, যন্ত্রাংশ) মাঝারি হারে, আর সম্পূর্ণ তৈরি পণ্যে সবচেয়ে বেশি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় নব্বই শতাংশ ছুঁয়ে ফেলে। এই সিঁড়ি দেশি বাজারে বিক্রি করা প্রস্তুতকারকের জন্য একধরনের সুরক্ষিত দুর্গ তৈরি করে দেয়—বিদেশি প্রতিযোগী প্রায় ঢুকতেই পারে না।
কিন্তু এই দুর্গের একটা মূল্য আছে। রপ্তানিকারককে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা মূলক দামে লড়তে হয়, যেখানে দেশের বাজারে বিক্রি করা যায় অনেক বেশি লাভে। গবেষণায় দেখা গেছে, একই পণ্য রপ্তানি করলে দেশে বিক্রির তুলনায় লাভ প্রায় অর্ধেক নেমে আসে। ফলে যেকোনো যুক্তিবাদী উদ্যোক্তা দেশের বাজারকেই বেছে নেয়। এই কারণেই পোশাকশিল্পের বাইরে বাংলাদেশ কোনো বড় দ্বিতীয় রপ্তানি-খাত তৈরি করতে পারেনি—রপ্তানিযোগ্য পণ্য আর সক্ষমতা দুটোই আছে, কিন্তু রপ্তানি করাটাই লোকসানের পথ।
মাঝের ধাপ: যেখানে শিল্প দাঁড়াতে পারে না
সিঁড়ির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হলো মাঝের ধাপ—যারা কাঁচামাল থেকে অন্তর্বর্তী পণ্য বানায়, যেমন সুতা, কাপড়, শিল্প-রাসায়নিক বা যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক। এদের পণ্যের ওপর শুল্ক-সুরক্ষা নামমাত্র, অথচ এদের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য ক্রেতা—রপ্তানিকারক—বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় একই পণ্য বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত আমদানি করতে পারে। ফলে মাঝের ধাপের উৎপাদক দুই দিক থেকেই অরক্ষিত—দেশের বাজারে সুরক্ষা নেই, রপ্তানির বাজারে নিশ্চিত ক্রেতা নেই।
এই কাঠামোর মধ্যেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম দাঁড়িয়েছিল—দেশি সুতা ও কাপড় শিল্প, যা গড়ে উঠেছিল ইউরোপের বিশেষ শর্তের চাপে (স্বল্পোন্নত দেশের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে কাপড় দেশে বোনা থাকতে হতো)। কিন্তু ২০১১ সালে সেই শর্ত শিথিল হওয়ার পর থেকে এই শিল্পের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় গার্মেন্ট খাতের ক্রয়-চাহিদা।
২০২৫: বিকল্প যখন বাস্তবে জেগে ওঠে
সাম্প্রতিক সময়ে ভর্তুকি প্রাপ্ত সস্তা ভারতীয় সুতা বন্ডের পথে শুল্কমুক্ত ঢুকতে শুরু করায় দেশি সুতাকল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে—বহু মিল বন্ধ বা অর্ধক্ষমতায় চলছে, বিপুল অবিক্রীত মজুত জমেছে। এখানে কেউ আইন ভাঙছে না; বন্ডের নিয়ম মেনেই গার্মেন্ট-মালিক সস্তা বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও মিল-মালিকদের সংগঠন এক পক্ষে, গার্মেন্ট-মালিকদের সংগঠন অন্য পক্ষে—দুটোই দেশি শিল্প, অথচ নীতি-সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে।
এই বিরোধের তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা হারানোর পথে। সেই মর্যাদা গেলে ইউরোপের পুরনো শর্তটা ফিরে আসতে পারে—কাপড় দেশে বোনা থাকতে হবে। শার্ট-প্যান্টের কাপড়ের একটা বড় অংশ এখনো আমদানি নির্ভর, বন্ডের পথেই আসে। অর্থাৎ আজ গার্মেন্ট খাত যে দেশি সুতাকলকে সংকটে ফেলছে, কয়েক বছর পরে সেই সুতাকলই তার ইউরোপ-বাজার টিকিয়ে রাখার শর্ত পূরণ করবে।
সমাধান জমিতে নেই, শর্তে আছে
রাষ্ট্রের চিরাচরিত সমাধান হলো ভর্তুকি ও প্লট বরাদ্দ—রপ্তানি প্রণোদনা বহু খাতে বিতরণ করা হয়, অথচ ফল আসে হাতে গোনা কয়েকটি খাত থেকে। কোরিয়া-তাইওয়ানের মডেলে প্রণোদনা ছিল লক্ষ্যভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ; বাংলাদেশে এটা একবার পেলে চিরস্থায়ী অধিকারে পরিণত হয়। ছোট উদ্যোক্তার প্রকৃত সংকট জমির অভাব নয়—বহু শিল্পনগরীতে প্লট খালি পড়ে আছে—বরং ঋণপ্রাপ্তির অভাব।
মূল সমস্যা তাই কোনো একক সংস্থার দুর্বলতা নয়, বরং চার দশক ধরে চলা শুল্ক-কাঠামোর নকশা, যা রপ্তানি ও দেশি বিক্রির মধ্যে লাভের ব্যবধান তৈরি করে রাখে। যতদিন এই ব্যবধান না কমবে, ততদিন বাজার নয়, নীতি-সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে কোন শিল্প বাঁচবে আর কোনটা বাঁচবে না। চামড়ার সেই হারানো এক ডলার আসলে একটা প্রতীক—প্রতিটি খাতে যে মূল্য দেশে তৈরি হতে পারত অথচ কাঠামোগত কারণে বাইরে চলে যাচ্ছে, তাকে দেশে ধরে রাখাই শিল্পনীতি। বাকি সব কেবল জমির হিসাব।

