চীনের পরেই যে দেশটি সবচেয়ে বেশি কৃষিপণ্য উৎপাদন করে, সেটি কিন্তু ভারত। আর তারপরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল। এই চারটি দেশ মিলে বিশ্বের মোট কৃষি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ দখল করে আছে। এই তালিকার ২৪ নম্বরে আছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের কৃষিখাতের উৎপাদন মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের মাত্র ০.৬ শতাংশ। এই সংখ্যাটা শুনতে অনেকের কাছে হয়তো খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এটা আসলে একটা বিশাল অর্জনের গল্প এবং একইসঙ্গে কিছু কঠিন সত্যের দিকেও ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্বের মোট কৃষি উৎপাদনের বাজার ২০২৪ সালে ছিল ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিরাট পাই-এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ০.৬ শতাংশ। চীন একাই উৎপাদন করেছে ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য, যা বিশ্বের ৩৫.৬ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতের উৎপাদন ৫৭৩ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫১ বিলিয়ন আর ব্রাজিলের ২০৪ বিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলে বোঝা যায়, কৃষিখাতে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ব্যবধান কতটা আকাশ-পাতাল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৩৪ বিলিয়ন ডলারের এই অবস্থানটি কি বাংলাদেশের জন্য সত্যিই কম?
একটু অন্য চোখে দেখার চেষ্টা করা যাক। মাত্র দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের এই দেশটি, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মানুষের ঘনত্ব বিশ্বের অন্যতম বেশি, সেখানে কৃষি উৎপাদনের মূল্য ৩৪ বিলিয়ন ডলার এটা কিন্তু কোনও কম কথা নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট শস্য উৎপাদন ছিল গড়ের চেয়ে বেশি ৬৬.৫ মিলিয়ন টন। ধান উৎপাদন হয়েছে ৬০.২ মিলিয়ন টন। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয়। মাছ উৎপাদনে দেশটি বিশ্বে দ্বিতীয়। সবজি উৎপাদনেও বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এই অর্জনগুলো কিন্তু কয়েকটি বড় দেশের কাছেও নেই।
কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের পেছনে আছে আরেকটি বাস্তবতা, যা অনেকটা উদ্বেগেরও। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ক্রমশ কমছে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে এই অবদান ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ১১ শতাংশে। অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এই পরিবর্তনটাকে খারাপ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই এটা উন্নয়নেরই একটি স্বাভাবিক ধারা। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটা হলো: জিডিপিতে অংশ কমলেও, কৃষির ওপর যে লক্ষাধিক মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে, সেই বাস্তবতা কি বদলাচ্ছে?
বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনও কৃষিখাতে নিয়োজিত। প্রায় ৪.৫ কোটি মানুষ কোনও না কোনওভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অথচ জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ১১ শতাংশ। এর মানে, বিপুল সংখ্যক মানুষ তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদনশীল একটি খাতে আটকে আছেন। কৃষকদের আয় বাড়ছে না, বরং উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে। ধান চাষের খরচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি, সার, কীটনাশক আর শ্রমের দাম বাড়ছে, অথবা বাজারে ধানের দাম কমছে। ফলে অনেক কৃষকই ঋণের ফাঁদে পড়ছেন। কেউ কেউ চাষাবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন। সুনামগঞ্জের এক কৃষক ‘আলী আকবর’ বলেছেন, “চাষে তো কোনো লাভ নেই। কষ্ট করে কোনোমতে বেঁচে আছি”। এই কথাগুলো শুধু একজনের কথা নয়, এটা লাখ লাখ কৃষকের প্রতিনিধিত্বমূলক বক্তব্য।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম। অসময়ে বৃষ্টি, খরা, লবণাক্ততা, বন্যা এসব নিয়মিত হয়ে উঠেছে কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের বিশাল অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। নেত্রকোনায় ১৩ হাজারের বেশি হেক্টর জমি ডুবে যায়। একজন কৃষক তার ছয় বিঘা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনাগুলো শুধু খবরের শিরোনাম নয় এগুলো প্রকৃত মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
তবে ইতিবাচক দিকটাও কিন্তু উল্লেখ না করলে গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলাদেশের কৃষি কিন্তু শুধু দেশকে খাওয়াতেই সক্ষম হচ্ছে না, রপ্তানিতেও ভূমিকা রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ কৃষিপণ্য রপ্তানি করেছে ৯৮৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৯৬৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কিছুটা বেশি। হিমায়িত ও লাইভ মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩.০১ শতাংশ। আলু রপ্তানি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবজি রপ্তানি বেড়েছে কয়েক গুণ। এই অগ্রগতি কিন্তু আশার আলো দেখায়।
বাংলাদেশের কৃষি এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম কৃষি অর্থনীতি হওয়ার কৃতিত্ব, অন্যদিকে কৃষকের আয় কমে যাওয়া, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব আর শ্রমশক্তির বড় অংশের স্বল্প উৎপাদনশীলতা। এই দুই সত্যের মাঝখানেই রয়েছে ভবিষ্যতের পথ। যদি কৃষিকে আরও আধুনিক করা যায়, জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসলের ওপর জোর দেওয়া যায়, আর কৃষকদের জন্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা যায় তাহলে এই ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ভিত্তিটাকেই আরও শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব। সেটা হলে বাংলাদেশ শুধু ২৪ নম্বরে থেমে থাকবে না, এই তালিকায় আরও উপরে উঠে আসার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হবে।

