১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের চিকিৎসা শিক্ষার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে আসছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো হয়ে গেছে তার অবকাঠামো। দেওয়ালে ফাটল, ছাদ থেকে ঝরে পড়া প্লাস্টার, আর আবাসন সংকট এসব যেন ঢামেকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই বাস্তবতাকে বদলে ফেলতে এবার বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গত ১৯ আগস্ট ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অব্যবহৃত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
প্রকল্পটির আওতায় তৈরি হবে মোট পাঁচটি নতুন ভবন তিনটি ১৫ তলা এবং দুটি ৪ তলা। এর মধ্যে রয়েছে ১৫ তলা একটি একাডেমিক ভবন, যেখানে থাকছে তিনটি বেজমেন্ট, ৩০০ আসনের চারটি লেকচার থিয়েটার ও দুটি পরীক্ষা কক্ষ। শিক্ষার্থীদের জন্য ১৫ তলার একটি হোস্টেল তৈরি হবে, যেখানে থাকার ব্যবস্থা থাকবে ৮০০ জনের। কর্মকর্তাদের জন্য ১৫ তলার একটি আবাসিক কোয়ার্টার ভবনও থাকছে দুটি বেজমেন্টসহ। এ ছাড়া চারতলার একটি সার্ভিস ভবন এবং ৮০০ মুসল্লির ধারণক্ষমতার একটি চারতলা মসজিদও নির্মিত হবে।
শুধু ভবনই নয়, পুরো ক্যাম্পাসের অবকাঠামো আধুনিকায়ন করা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি), গভীর নলকূপ, অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংযোগ, এলপিজি ব্যবস্থা, আধুনিক লিফট, শক্তি সাশ্রয়ী আলো, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা এসব আধুনিক সুবিধাও থাকছে প্রকল্পে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্প্রসারণ, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান একাডেমিক ভবন ও হোস্টেলগুলো মেরামতের অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ।
কিন্তু কেন এই প্রকল্প এত জরুরি হয়ে উঠল? ঢাকা মেডিকেল কলেজের অনেক ভবনই সময়ের সাক্ষী হয়ে জীর্ণ হয়ে গেছে। কলেজটিতে বর্তমানে এমবিবিএস ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে চারটি আবাসিক হল। তাদের মধ্যে ডা. ফজলে রাব্বি হল যেটি ১৯৫৫ সালে তৈরি সেখানকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এই হলের ধারণক্ষমতা প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থীর, কিন্তু পুরোনো হওয়ার কারণে এর চতুর্থ তলাটি গণপূর্ত অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। সেখানে প্রায় ৩০টি কক্ষ রয়েছে, কিন্তু সেগুলো আর ব্যবহারের উপযোগী নেই। ফলে প্রতি বছর নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য থাকার জায়গা সংকট তৈরি হচ্ছে।
এই আবাসন সংকট গত বছরই চরম আকার ধারণ করে। ২০২৫ সালের মে মাসে শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবিতে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল নতুন ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেলের জন্য অবিলম্বে বাজেট অনুমোদন, নতুন ভবন না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা, পুরোনো একাডেমিক ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা এবং নতুন একাডেমিক ভবনের জন্য বাজেট বরাদ্দ। আন্দোলন চতুর্থ সপ্তাহে পৌঁছালে ২১ জুন কলেজ কর্তৃপক্ষ সব একাডেমিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়। তবে শিক্ষার্থীরা সে নির্দেশ অমান্য করে। প্রায় ২০ দিন বন্ধ থাকার পর ১২ জুলাই কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম আবার চালু হয়। শিক্ষার্থীদের একজন তখন বলেছিলেন, “আমাদের ডা. ফজলে রাব্বি হলের ছাদ থেকে প্লাস্টার ঝরছে। দেওয়াল ও খুঁটির অবস্থাও খুব খারাপ। তাই আমরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন হল দাবি করছি”।
এই প্রকল্পের মাধ্যমেই সেই দাবিগুলোর একটি বড় অংশ পূরণ হতে চলেছে। তবে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ নয়, আরও ১০টি মেডিকেল কলেজের জন্য ১৯টি আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণের একটি পৃথক প্রকল্পও একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। সেখানেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের জন্য আরও দুটি নারী শিক্ষার্থী হোস্টেল তৈরি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে’-তে এসব প্রকল্পের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। তবে তখন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গত ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রায় ছয় মাসের মাথায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তালিকাভুক্ত হয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর একনেক প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে, যা ঢামেকের পড়াশোনা ও আবাসন সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। পুরো টাকা দেবে সরকার। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু হয়ে ২০৩০ সালের আগস্টের মধ্যে শেষ হবে। নতুন ভবনগুলো বকশিবাজারের বর্তমান পড়াশোনা ও আবাসন এলাকার আশপাশে নির্মিত হবে। রাস্তার পাশে ও মর্গের কাছে কিছু টিনশেড ভবন ভেঙে ফেলা হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই রূপান্তর কিন্তু শুধু একটি প্রকল্প নয় এটি দেশের চিকিৎসা শিক্ষার ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় অধ্যায়ের সূচনা। ১৯৪৬ সালে যে কলেজটি যাত্রা শুরু করেছিল, সেই কলেজ এখন আধুনিকতার নতুন দিগন্তে পা রাখছে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, পুরোনো অবকাঠামোর ঝুঁকি এসব ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। তবে এই উন্নয়ন যেন শুধু ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

