দেশের শিল্পকারখানাগুলো আবারও তীব্র গ্যাসস্বল্পতার মুখে পড়েছে, যার প্রভাবে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
নরসিংদীর গ্যাস পরিস্থিতিতে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও এখনো অনেক কারখানা পুরোদমে উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এর মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-সংকট নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যা পণ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
বিভিন্ন শিল্প খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হবিগঞ্জ ও ভোলা অঞ্চল বাদে দেশের বাকি প্রায় সব এলাকার গ্যাসনির্ভর কারখানাই কমবেশি এই সংকটের শিকার। উৎপাদন থমকে যাওয়ায় মালিকপক্ষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে বড় সংকটে পড়বেন উদ্যোক্তারা।
প্রায় এক মাস আগে একটি এলএনজি সরবরাহ টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে দেশজুড়ে শিল্পখাতে এই গ্যাস-সংকটের সূত্রপাত। গত শনিবার সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় স্বস্তির আভাস মিলেছিল—সামিট টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হয়েছিল। কিন্তু সংকট পুরোপুরি না কাটতেই আবার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। টানা তিন দিন সরবরাহ কমতে কমতে গতকাল বুধবার বিকেল তিনটার দিকে কার্গো-সংকটের কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে সিরামিক শিল্পমালিকদের সংগঠনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, হবিগঞ্জ ও ভোলা ছাড়া অন্য কোথাও কারখানা সচল নেই বললেই চলে। তিনি জানান, বসে থাকা ছাড়া উদ্যোক্তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই এবং এই অবস্থা চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
সরেজমিন নরসিংদী শহর ও মাধবদী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দশটি গ্যাসনির্ভর কারখানার অধিকাংশই বন্ধ পড়ে আছে। কয়েকটি কারখানায় গেটের ভেতরে শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন, কাজ নেই বলে হাতে-পায়ে যেন ছন্দ নেই।
নরসিংদী শহরের একটি ডাইং ও প্রিন্টিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরেই অবস্থান করছেন। মেঝেজুড়ে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে শত শত শাড়ি, আর মেশিনের ভেতরে রয়ে গেছে ভেজা কাপড়। কারখানাটির এক প্রিন্টিং মাস্টার জানান, পাঁচ দিন আগে একদিনের জন্য গ্যাস পাওয়া গিয়েছিল, তখন প্রসেসের জন্য কাপড় ভেজানো হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই গ্যাস চলে যাওয়ায় প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি, ফলে পাঁচ দিন পরও কাপড় মেশিন থেকে নামানো সম্ভব হয়নি। কাপড়গুলো পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যাতে আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সবার অবস্থা একরকম নয়। নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় অবস্থিত একটি বড় শিল্পগ্রুপের কারখানায় উৎপাদন মোটামুটি স্বাভাবিক আছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ কম থাকলেও দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ওই গ্রুপের এক পরিচালক জানান, নরসিংদী ও গাজীপুরে তাদের পাঁচটি শিল্পপার্কে বর্তমানে গ্যাসের চাপ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে এবং উৎপাদন পুরোদমে চলছে।
কেন এই বৈষম্য—তা ব্যাখ্যা করেছেন তিতাস গ্যাসের নরসিংদী আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্যমতে, নরসিংদীর শিল্পকারখানার চেয়েও বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হয় ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার, পাশাপাশি রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদাও। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় বর্তমানে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সবার আগে, আর সার কারখানার চাহিদা মিটিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে, সেটুকুই শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের চিত্রও উদ্বেগজনক। গাজীপুরের মাওনা এলাকার একটি সিরামিক কারখানায় গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশে। দৈনিক বাইশ হাজার পিস তৈজসপত্র তৈরির সক্ষমতা থাকলেও গতকাল উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ছয় হাজার পিস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, গত তিন দিনে সংকট আরও তীব্র হয়েছে; আগে রাতের বেলা কিছুটা চাপ পাওয়া গেলেও এখন তা-ও মিলছে না। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ প্রয়োজন এমন তৈজসপত্র বর্তমানে তৈরি করা যাচ্ছে না, ফলে অনেক ক্রয়াদেশ স্থগিত রাখতে হয়েছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ ৩০০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি থাকলে মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হয়; স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দিয়েও রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু গত শুক্রবার বিকেলে মোট সরবরাহ নেমে গিয়েছিল ১৭৩ কোটি ঘনফুটে। শনিবার সন্ধ্যায় তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৪ কোটি ঘনফুটে, তবে গতকাল আবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১৮ কোটি ঘনফুটে—অর্থাৎ সংকট এখনো কাটেনি, বরং ওঠানামা করছে অস্থিরভাবে।
নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্প এলাকাতেও মঙ্গলবার দুপুর থেকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কাপড় রং ও ফিনিশিং কারখানাগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের একটি সংগঠনের সভাপতি বলেন, দুই দিন ভালো গ্যাসের চাপ পাওয়ার পর মঙ্গলবার দুপুর থেকে ফের গ্যাস না থাকায় ডাইং কারখানাগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি বা দুর্ঘটনার মতো একটিমাত্র ঘটনা কীভাবে গোটা শিল্পখাতকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় ফেলে দিতে পারে, তা এই সংকট স্পষ্ট করে দিয়েছে। সার ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও, তার প্রত্যক্ষ মাশুল গুনতে হচ্ছে রপ্তানিমুখী শিল্পখাতকে—যার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে লাখো শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প সরবরাহ উৎস প্রস্তুত রাখা এবং টার্মিনাল-নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করা ছাড়া এই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

