গ্যাসের চাপ যখন একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, তখন সাইজিং মিলের বয়লার চালানোর জন্য বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবতে হয়। নরসিংদীর চৌয়ালা শিল্প এলাকার হক টেক্সটাইল মিলে সেই বিকল্প এখন কাঠ। বয়লার অপারেটর মোহাম্মদ শাখাওয়াত জানালেন, আগে তারা পুরোনো কাপড়ের কুঁচি পোড়াতেন। কিন্তু সেটার দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ কিনে পোড়াচ্ছেন। প্রতিটি কারখানাকে প্রতিদিন কাঠের পেছনে খরচ করতে হচ্ছে ১০ হাজার টাকার বেশি।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে নরসিংদীতে গ্যাস সংকট শুরু হলেও গত তিন দিনে তা চরম আকার ধারণ করেছে। এর জেরে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ কারখানার সংখ্যা কিছু সূত্রে তিন শতাধিকও বলছে। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান জানিয়েছেন, গ্যাস না পেয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বসে আছেন। বাসাবাড়িতেও চুলা জ্বলছে না, সিএনজি পাম্পে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে। নরসিংদীর ১৭টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ১৩টিই বন্ধ হয়ে গেছে। চারটি স্টেশন চালু থাকলেও সেখানে গ্যাসের চাপ খুবই কম।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি। ২১ জুলাই ওই ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর থেকেই নরসিংদীসহ আশপাশের জেলাগুলোতে গ্যাস সংকট শুরু হয়। ৬ আগস্ট কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পাঁচ দিন পর আবার সংকট বেড়ে যায়। ১৭ আগস্ট রাত থেকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আবাসিক ও শিল্প গ্রাহকদের সংযোগ বন্ধ করে দেয়।
নরসিংদীতে স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য ১০-১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সেই চাপ নেই বললেই চলে। তিতাস গ্যাসের নরসিংদী আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. মকসুদুর রহমান জানিয়েছেন, জেলায় কার্যত গ্যাসের চাপ নেই। যা কিছু সরবরাহ আসে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় দেওয়া হচ্ছে।
কারখানা মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, এই সংকটে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। কোথাও এই ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বলা হচ্ছে। আর শুধু ক্ষতি নয়, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানায় রাসায়নিক মেশানো কাপড় পচে যাচ্ছে। তিন দিন আগে উৎপাদনের সময় গ্যাসের চাপ কমে গেলে মেশিন বন্ধ হয়ে যায়, আর ওই অবস্থায় ফ্যাব্রিকগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ডাইং খাতেই শুধু ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
মোমিন টেক্সটাইল মিলের ১০টি ইউনিটের মধ্যে ৭টিই বন্ধ। রপ্তানিমুখী এই কারখানায় দৈনিক ২২-২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন, কিন্তু মিলছে মাত্র ৮-১০ হাজার ঘনফুট। যেখানে উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ২৫ লাখ গজ ফ্যাব্রিক, সেখানে এখন উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ২০ হাজার গজে। ২৫০০ শ্রমিকের মধ্যে ১৫০০ জন এখন কাজ পাচ্ছেন না।
আল মদিনা টেক্সটাইলের মালিক মোহাম্মদ ইরতাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাইজিং মিল বন্ধ থাকায় তারা সুতা প্রক্রিয়াজাত করতে পারছেন না। আগে যেখানে দৈনিক ১ লাখ গজ উৎপাদন হতো, এখন ৩০ হাজার গজও হচ্ছে না। ১৫০ শ্রমিকের মধ্যে ১০০ জনকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকরা। বিদেশি ক্রেতারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করছেন। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে শিল্প খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে পড়বে।

