বিশেষ প্রতিবেদন
রোববার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যাঁরা শেষবারের মতো পাম্প থেকে তেল ভরিয়েছিলেন, তাঁরা ভাগ্যবান। কারণ মধ্যরাত পেরোতেই দেশের ইতিহাসে একদিনে সবচেয়ে বড় লাফে বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের দাম। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন; চার ধরনের তেলেই সরকার একসঙ্গে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেল এখন ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা আর অকটেন ১৬৫ টাকা। এই একই সময়ে আরেকটি ঘটনাও ঘটছে দেশে; নবম জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর হাতে আসতে শুরু করেছে বাড়তি বেতন। দুটো ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন মনে হলেও, বাস্তবে এরা একসঙ্গে মিলে একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসছে, যাঁদের বেতন বাড়ল না, তাঁরা এই দুই ধাক্কা কীভাবে সামলাবেন।
বিশ্ববাজারে দাম আসলেই কমেছে, নাকি এটা একটা ভুল ধারণা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রজ্ঞাপনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেটা শুনতে প্রচলিত ধারণার উল্টো মনে হয়। সরকারের ভাষ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও জাহাজভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কোনো কোনো হিসাবে দ্বিগুণেরও বেশি। এই দাবি যাচাই করলে দেখা যায়, বছরের বড় ছবিটা আসলে এই ব্যাখ্যাকেই সমর্থন করে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম চলতি বছরের শুরুতে ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের ঘরে, এপ্রিলের শেষে সৌদি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কায় তা এক পর্যায়ে ১২০ ডলার ছুঁয়ে ফেলে, আর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েও ঘোরাফেরা করেছে ১০৫-১০৬ ডলারের আশপাশে। তবে ঠিক প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সময়েই বাজারের ছবিটা পাল্টাতে শুরু করেছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস ও মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট; দুটোরই দাম নেমে আসে গত ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে, আর ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ১৫ ডলার বা ২ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে নামে ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে। অর্থাৎ ব্যাপারটা এমন দাঁড়াচ্ছে যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বছরজুড়ে যে বিশাল উল্লম্ফন ঘটেছে, তার তুলনায় গত কয়েক দিনের এই পতন নিতান্তই সাম্প্রতিক ও স্বল্পমেয়াদি একটা সংশোধন। আসল হিসাবটা হলো, সরকার যে বাড়তি মূল্য আরোপ করেছে, তার ভিত্তি মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসের পুঞ্জীভূত লোকসান, যে সময়ে দাম ছিল অনেক বেশি চড়া। ফলে প্রজ্ঞাপন জারির ঠিক মুহূর্তে বাজারে সামান্য দরপতন ঘটলেও, সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি তাতে ভুল প্রমাণিত হয় না। বরং এখান থেকে একটা শিক্ষা পাওয়া যায়, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার দিন দিন এমনকি ঘণ্টায় ঘণ্টায় ওঠানামা করে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যনীতি নির্ধারিত হয় মাসের পর মাসের গড় প্রবণতা দেখে। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনের দরপতন বা উল্লম্ফনকে ভিত্তি ধরে পুরো সিদ্ধান্তকে বিচার করাটা বিভ্রান্তিকর।
লোকসানের অঙ্কটা কেমন দাঁড়িয়েছিল বিপিসির খাতায়
প্রজ্ঞাপনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। বর্তমান আন্তর্জাতিক দরে প্রতি লিটার ডিজেলে সংস্থাটির লোকসান হচ্ছিল প্রায় ৮৯ টাকা, যার অর্থ প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। এই হারে চললে শুধু ডিজেলেই বছরে লোকসান দাঁড়াতে পারত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায়। লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে এই লোকসান বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে সরকারের হিসাব। এখানে অর্থনীতির একটা মৌলিক নিয়ম কাজ করছে; কোনো পণ্যের দাম বাজারদরের চেয়ে কৃত্রিমভাবে কম রাখলে সেই ফারাকটা কোথাও না কোথাও থেকে পূরণ করতে হয়, হয় ভর্তুকি দিয়ে, নয়তো ঋণ করে, নয়তো একসময় দাম বাড়িয়ে। এতদিন সরকার জনস্বার্থের কথা ভেবে সেই ফারাক নিজে বহন করছিল। কিন্তু ভর্তুকি অসীম সময় ধরে টেনে নেওয়া যায় না, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের নিজস্ব সীমা আছে, আর সেই সীমাতেই সরকার এবার হাত দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
যে বেতন বাড়ল, তা কতটা এবং কার জন্য
ঠিক এই সময়েই কার্যকর হচ্ছে নবম জাতীয় পে-স্কেল, যা গত ১৭ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং সরকারিভাবে গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হচ্ছে। নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়ছে ১০০ শতাংশ, আর ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে বাড়ছে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে নিচের গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন আগের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২০ হাজার টাকায়, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে তা ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে হচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে পুরো বাড়তি টাকা একবারে হাতে আসবে না; চার ধাপে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে এই কাঠামো। পুরোপুরি চালু হলে সরকারি কোষাগার থেকে বছরে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বৃদ্ধি মূলত দীর্ঘদিনের বকেয়া সমন্বয়, ১১ বছর পর প্রথমবার নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারিত হচ্ছে, ফলে এই যুক্তিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যখানে, এই সুবিধা পাচ্ছেন দেশের প্রায় সতেরো কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ৩৩ লাখের মতো মানুষ। বাকিরা এই বাড়তি ব্যয়ের ভার বহন করছেন করদাতা হিসেবে, অথচ তাঁদের নিজেদের আয় বাড়ছে না একই হারে।
মূল্যস্ফীতির কাঁটা নামছে কাগজে-কলমে, বাস্তবে নয়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ হিসাবে, আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমে হয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। শুনতে যতটা স্বস্তিদায়ক মনে হয়, বাস্তব চিত্র ততটা সহজ নয়। কারণ একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বরং বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে, আর মাসভিত্তিক হিসাবে সাধারণ মূল্যসূচক বেড়েছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ, খাদ্যপণ্যে তা প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বার্ষিক হারে সামান্য নিম্নগতি দেখা গেলেও, মাসে মাসে বাজারের ব্যাগ তুলনামূলক খালিই থেকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের একজন অর্থনীতিবিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় চার বছর বা ৪০ মাসের বেশি সময় ধরে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মজুরি কমছেই, কারণ নামমাত্র মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি পূর্বাভাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম ও অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকটে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন, আর এই সংঘাতের কারণে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যেতে পারেন।
দুটো সিদ্ধান্ত একসঙ্গে এলে অর্থনীতি কোন দিকে হাঁটে
এখানেই দাঁড়িয়ে আছে এই প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণ। জ্বালানির দাম বাড়ানো একটি ব্যয়-জনিত বা কস্ট-পুশ চাপ; এতে পরিবহন খরচ বাড়ে, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, আর সেই বাড়তি খরচ ঘুরেফিরে নিত্যপণ্যের দামেও যুক্ত হয়। অন্যদিকে সরকারি বেতন খাতে একসঙ্গে লক্ষ কোটি টাকার বেশি বাড়তি অর্থ ছাড়া মানেই বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বেড়ে যাওয়া, যাকে অর্থনীতিতে চাহিদা-জনিত বা ডিমান্ড-পুল চাপ বলা হয়। উৎপাদন বা সরবরাহ একই থেকে গেলে বাজারে টাকার পরিমাণ বাড়লে দামও বাড়ে, এটি মুদ্রা সরবরাহ ও মূল্যস্তরের সম্পর্ক নিয়ে অর্থনীতির একেবারে প্রতিষ্ঠিত নীতি, নতুন কোনো তত্ত্ব নয়। সমস্যা হলো, এই দুটো চাপ যখন প্রায় একই সময়ে আসে, তখন তার ফল যোগ নয়, বরং গুণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যাঁরা পে-স্কেলের সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদের জন্য বাড়তি আয় হয়তো তেলের দামবৃদ্ধির চাপ কিছুটা সামলে দেবে। কিন্তু যাঁরা বেসরকারি খাতে বেতনভুক্ত, দিনমজুরি করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা চালান বা নির্দিষ্ট আয়ের পেনশনভোগী অথচ সরকারি স্কিমের বাইরে; তাঁদের জন্য এই দুই সিদ্ধান্তের প্রথমটির (মূল্যস্ফীতি) পুরো চাপ এসে পড়ছে, অথচ দ্বিতীয়টির (বেতন বৃদ্ধি) কোনো সুরাহা তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত ভারসাম্যটা কোথায়
জ্বালানির দাম বাড়ানোর যুক্তি যেমন অস্বীকার করা কঠিন; রাষ্ট্র অনন্তকাল লোকসান বহন করতে পারে না, তেমনি এক যুগের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির যুক্তিও ফেলে দেওয়া যায় না। প্রশ্নটা এই দুটো সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে নয়, বরং তাদের সময়ের মিলন নিয়ে। একদিকে রাষ্ট্রের কোষাগার হালকা করার চেষ্টা, অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, দুটোই যখন একই মাসে কার্যকর হয়, তখন তার সম্মিলিত চাপ গিয়ে পড়ে ঠিক তাঁদের ওপর, যাঁদের না আছে ভর্তুকির সুরক্ষা, না আছে বেতনবৃদ্ধির সুবিধা। আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই বলে দেবে সরকার এই ভারসাম্য কতটা সামলাতে পেরেছে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

